বদলাচ্ছে জাহাজভাঙা শিল্প, সমুদ্রে ফিরছেন সীতাকুণ্ডের ‘জলদাস’রা

Passenger Voice    |    ১২:৩৪ পিএম, ২০২৬-০৭-০৫


বদলাচ্ছে জাহাজভাঙা শিল্প, সমুদ্রে ফিরছেন সীতাকুণ্ডের ‘জলদাস’রা

একসময় সীতাকুণ্ডের উপকূলে ১৫০টি ইয়ার্ড ছিল। হাজার হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করতেন—যাদের অনেকেই দেশের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র এলাকাগুলো থেকে এসেছিলেন। সেই ১৫০টি ইয়ার্ডের বেশির ভাগই এখন বন্ধ।

হরিকমলের কাছে সমুদ্র শুধু জীবিকা নয়, তার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে এটি। তিনি একজন 'জলদাস', অর্থাৎ 'জলের মানুষ'। কয়েক শতাব্দী ধরে তার পূর্বপুরুষদের ধমনিতে বয়েছে লোনাপানি।

তার বাবা এবং পূর্বপুরুষদের মতো হরিকমলও ১৯৯১ সাল পর্যন্ত একজন জেলে ছিলেন। সে বছর উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। সমুদ্র থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত হরিকমলের গ্রামটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। 

হরিকমল বলেন, 'তখন তো টেলিভিশন ছিল না, রেডিওর সিগন্যালও খুব দুর্বল ছিল। তাই ঘূর্ণিঝড় যে আসছে, তা জানার কোনো উপায়ই ছিল না।' ওই ঘূর্ণিঝড়ে তিনি তার মা এবং চার সন্তানকে হারান।

হরিকমল স্মৃতিচারণা করে বলেন, 'আমি আমার পরিবার, আমার বাড়ি—সবকিছু হারিয়েছিলাম। আমাকে আবার শূন্য থেকে সবকিছু শুরু করতে হয়েছিল।'

তিনি জানান, প্রতি বছরই সমুদ্রে মাছ কমতে থাকে। শিপব্রেকিং ইয়ার্ড (জাহাজভাঙা শিল্প) থেকে নির্গত গ্রিজ ও বর্জ্যের দুর্গন্ধে মাছেরা দূরে সরে যেতে শুরু করে। একসময় জেলে হিসেবে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেন তিনি। 

এভাবেই কয়েক শ বছর ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্যের অবসান ঘটে এবং তিনি হয়ে যান একজন জাহাজভাঙা শ্রমিক (শিপব্রেকার)।

জলদাসদের হারিয়ে যাওয়া

হরিকমলের মতো ধীরে ধীরে এই সম্প্রদায়ের অনেকেই জাহাজভাঙা শ্রমিকে পরিণত হন। এই 'সমুদ্রের মানুষেরাই' নিজেদের চারপাশের সমুদ্রকে ধ্বংস করতে শুরু করেন। যে হাতগুলো একসময় মাছ ধরত, সেই হাতগুলোই তখন বিশাল সব জাহাজ ভাঙতে শুরু করে। এই শিল্প যত বড় হতে থাকে, দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে তত বেশি মানুষ এখানে কাজ করতে আসেন—যাদের বেশির ভাগই ছিলেন অদক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, 'আগে এখানে প্রচুর দুর্ঘটনা ঘটত। আমি একজনকে চিনি, যে ইয়ার্ডে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় এক পা এবং এক চোখ হারিয়েছিল। তাকে প্রায় এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। এখানে একটা পায়ের দাম এটুকুই।' 

সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়া, গ্যাস বিস্ফোরণ এবং ধাতব পাতের নিচে চাপা পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু—এসব ছিল নিয়মিত ঘটনা। হাজার হাজার মানুষের হাতে বিশাল জাহাজগুলো টুকরো টুকরো হতো—আর এই প্রক্রিয়ায় মারা গেছেন অনেক শ্রমিক, অনেকেই পঙ্গু হয়েছেন, কিন্তু ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন নামমাত্র।তবে এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। 

আবার সমুদ্রে ফেরা

সীতাকুণ্ডের উপকূলরেখাটি এখন দেখলে মনে হয় যেন পরিত্যক্ত। একসময় যেখানে শুধু গ্রিজ আর পুরোনো ধাতব পাত পড়ে থাকত, সেখানে এখন ঘাস গজিয়েছে। বাতাসে আর তেলের গন্ধ নেই। এখন সেখানে সাগরের গন্ধ পাওয়া যায়।

মাঝে মাঝে ড্রিলিং এবং লোহা কাটার শব্দ নীরবতা ভেঙে দিলেও, জায়গাটা এখন অনেকটাই শান্ত—একটি কর্মচঞ্চল শিল্প এলাকার যতটা শান্ত হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি শান্ত। সমুদ্রের পাড় ধরে কয়েকটি কুকুর অলসভাবে হেঁটে বেড়ায়। আকাশে পাখিরা উড়ে বেড়ায়।
পুরোপুরি হয়তো সেরে ওঠেনি, কিন্তু কিছু একটা তো ফিরছে। 

হরিকমল এখন আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজ করেন না। গত বছর তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে।

তিনি বলেন, 'তারা এখন আর আমার মতো লোকদের কাজে নেয় না। এখন সেখানে কাজ করতে গেলে শিক্ষিত হতে হয়। এখন নিয়মকানুন অনেক আলাদা। ইঞ্জিনিয়ার ও সুপারভাইজাররা সব সময় শ্রমিকদের কাজ তদারকি করেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমি কোনো দুর্ঘটনার খবর শুনিনি।' 

তিনি আরও বলেন, 'শ্রমিকরা এখন এক ঘণ্টার লাঞ্চ ব্রেক পায় এবং সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরে যায়—আমাদের সময়ে আমরা এসব কল্পনাও করতে পারতাম না।'

তবে কাজ হারানো নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ, এই বেকারত্বই তাকে তার সেই চেনা সমুদ্রে ফিরিয়ে এনেছে। 

গ্রামের আরেক জেলে বাঁশি দাস বলেন, 'সময় তো লাগবেই। আর হ্যাঁ, এখন টিকে থাকাটা বেশ কঠিন। তবে ধীরে ধীরে মাছ ফিরতে শুরু করেছে। আপাতত চলার মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে, এটাই অনেক।'

আপাতত, জলদাসরা আবারও তাদের সেই চেনা সমুদ্রে ফেরার পথ খুঁজে পেয়েছে। সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, জেলেদের এই পর্যবেক্ষণ কোনো কল্পনা নয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলামের মতে, শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর বছরের পর বছর ধরে চলা লাগামহীন দূষণ সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

তিনি টিবিএসকে বলেন, 'যখন পরিবেশে একটানা দূষণ চলতে থাকে, তখন খুব কম প্রজাতির প্রাণীই সেই পরিবেশ সহ্য করে বাঁচতে পারে। কিন্তু যখন দূষণ কমে আসে এবং একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ফিরতে শুরু করে, তখন আরও অনেক প্রজাতি আবার সেখানে টিকে থাকতে পারে।'

কয়েক দশক ধরে তেল, শিল্পের বর্জ্য এবং ভারী ধাতুর দূষণ উপকূলের পরিবেশগত ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছিল। তবে এখন কঠোর পরিবেশগত নিয়মকানুন কার্যকর হওয়ায়, যেসব ইয়ার্ড নিয়ম মেনে চলছে, তারা সরাসরি সমুদ্রে বর্জ্য ফেলা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। 

গবেষকেরা মনে করেন, এ কারণেই হয়তো স্থানীয় জেলেরা আবার মাছ এবং উপকূলীয় গাছপালা ফিরে আসার কথা বলছেন।

তবে ড. ইসলাম সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই পুনরুদ্ধারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে, এমনটা ভাবা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, 'একবার বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে তা রাতারাতি ঠিক হয় না। এটি পুনরুদ্ধার হওয়া সম্ভব, তবে সময় লাগে।'

তিনি জানান, উপকূলরেখা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে গবেষকেরা এখন প্রায় এক দশকের তথ্য ব্যবহার করে জীববৈচিত্র্যের তুলনামূলক জরিপ করার কথা ভাবছেন।

পরিবর্তনের মূল্য 

একসময় সীতাকুণ্ডের উপকূলে ১৫০টি ইয়ার্ড ছিল। জাহাজভাঙা শিল্পের বিচারে এটি ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। হাজার হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করতেন—যাদের অনেকেই দেশের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র এলাকাগুলো থেকে এসেছিলেন।

সেই ১৫০টি ইয়ার্ডের বেশির ভাগই এখন বন্ধ। সীতাকুণ্ড বেল্টে এখন মাত্র ১৭টি 'আইএমও-অনুমোদিত' (ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন) শিপব্রেকিং ইয়ার্ড চালু রয়েছে। যেসব শ্রমিক আগে এখানে কাজ করতেন, তারা হয় বাড়ি ফিরে গেছেন, না হয় পেশা বদল করেছেন অথবা বেকার হয়ে পড়েছেন।

২০০৫ সালে ওয়াইপিএসএ-র এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, সীতাকুণ্ডের ৭০টি ইয়ার্ডে ২৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। সেই অনুপাতের ভিত্তিতে বর্তমানে চালু থাকা ১৭টি ইয়ার্ডে প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন বলে ধারণা করা হয়। শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, এই শিল্প এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিয়মকানুন মেনে চলার দিকে ঝুঁকছে। 

বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি ইয়ার্ডের একজন তত্ত্বাবধায়ক (কেয়ারটেকার) জানান, তিনি যে ইয়ার্ডে কাজ করতেন, সেটি এখন অন্য একটি কোম্পানির অধীনে চলছে, যারা সফলভাবে আইএমও-এর মানদণ্ড পূরণ করেছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কেয়ারটেকার বলেন, 'এটা দরকার ছিল। অনেকেই কাজ হারিয়েছে সত্যি, কিন্তু আগে তারা যে পরিবেশে কাজ করত, তা ছিল অমানবিক। গত কয়েক বছরে এখানে কেউ মারা যায়নি। আর এখন কেউ আহত হলেও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পায়। এসবের জন্য কয়েকজনের চাকরি যাওয়া খুব একটা বড় মূল্য নয়।'

আইএমও-এর মানদণ্ড পূরণের জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। সব ইয়ার্ডের পক্ষে এই কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করার সামর্থ্য ছিল না।

আগে এই এলাকায় ব্যবসার রমরমা অবস্থার কারণ ছিল সস্তা শ্রম এবং পরিবেশের ক্ষতির বিষয়ে সরকারের উদাসীনতা। উন্নত দেশগুলো খুব সহজে ও কম খরচে তাদের জাহাজ ভাঙার জন্য এই জায়গাকেই বেছে নিত—কিন্তু এখন আর সেই সুবিধা নেই।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম মহামারির আগে ইয়ার্ডগুলো থেকে রিসাইকেল করা লোহা এনে বিক্রি করতেন। কিন্তু বেশির ভাগ ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার ব্যবসা থমকে গেছে। তিনি এখন চালু থাকা একটি ইয়ার্ডের দারোয়ান হিসেবে কাজ করেন। 

সাইফুল বলেন, 'আমাদের ইয়ার্ডে এখন যে জাহাজটি ভাঙা হচ্ছে, সেটি এক বছর ধরে এখানে আছে। আগে একটা জাহাজ ভাঙতে মাত্র তিন-চার মাস লাগত। এখন তারা অনেক নিখুঁতভাবে কাজ করে, তবে ব্যবসা অনেকটাই কমে গেছে।'

জাহাজ পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ে আইএমও-র শর্ত পূরণে বিশ্বে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। 

নিয়ম মেনে চলার এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় মূল্যও চোকাতে হয়েছে। জাহাজ আমদানির হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ২০২৫ সালে রিসাইক্লিংয়ের জন্য দেশে এসেছে মাত্র ৮৪টি জাহাজ—যা গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন রেকর্ড। টিকে থাকা ইয়ার্ডগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত। যে জাহাজ ভাঙতে আগে তিন মাস লাগত, এখন তা ভাঙতে এক বছর লাগছে।

সস্তা শ্রমের যে সুবিধা দিয়ে এই শিল্পের বিকাশ হয়েছিল, তা এখন আর নেই।

তবে হরিকমল এবং জেলে সম্প্রদায়ের জন্য এই পরিবর্তন কিছু একটা ফিরিয়ে এনেছে। তারা তাদের জমি ফিরে পেয়েছেন। প্রকৃতি আবার উপকূলের কিছু অংশের দখল নিয়েছে এবং জলদাসরা সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিছু শিপইয়ার্ড এখনো টিকে আছে, তবে হরিকমল এই হিসাব-নিকাশ খুব ভালো করেই বোঝেন। 

তিনি বলেন, 'এটা ঠিক যে ইয়ার্ডগুলো এখনো পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি করে, তবে হাজার হাজার মানুষ তো এখানে কাজ করে খাচ্ছে।'

আপাতত, এই উত্তরটাই যথেষ্ট।


 সৌজন্যে টিবিসি