শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:০৫ পিএম, ২০২৬-০৭-০৪
রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের আলোচনা নতুন নয়। যানজট, উল্টো পথে চলাচল, সিগন্যাল অমান্য, হঠাৎ থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি—সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে এগুলোকে প্রধান সড়ক থেকে সরানোর বিষয়ে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগতভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও রয়েছে।
তবু রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে প্রতিদিনই দাপটের সঙ্গে চলছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কোথাও উল্টো পথে, কোথাও সিগন্যাল ভেঙে, আবার কোথাও রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে এসব যান। প্রশ্ন উঠছে, প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরানোর সিদ্ধান্তের কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবায়নে বাধা কোথায়?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশনা, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, পর্যাপ্ত জনবল, ডাম্পিং সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আটকে আছে। ফলে অভিযান চললেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। বরং নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল রাজধানীর যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এবং সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধ বা সীমিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এ নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি হয়নি।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, অটোরিকশা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগ—দুইপক্ষই মনে করছে, ঢাকার প্রধান সড়কে এসব যান চলাচলে বিধিনিষেধ দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে প্রথম ধাপে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে এদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে হবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে।
সঠিক সংখ্যা জানা নেই কারও
রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কত? এই প্রশ্নে সঠিক উত্তর বা নির্দিষ্ট কোনও পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। তবে বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশই দেশে তৈরি হচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ হতে পারে।
নিয়ন্ত্রণে বাধা কোথায়?
ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতায় তেমন কোনও পরিবর্তন আসেনি। বরং প্রধান সড়কে দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে এসব ধীরগতির যান চলাচল করায় তৈরি হচ্ছে জটলা, বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে তাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। প্রতিদিন শুধু এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অন্য কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাদের মতে, পুলিশের নিয়মিত অভিযান দিয়ে এককভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ অটোরিকশার মালিক ও গ্যারেজ মালিকদের একটি অংশের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে প্রশাসনিক, সরকারি ও রাজনৈতিক পর্যায়ের সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘অটোরিকশার কারণে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো উল্টো পথে চলাচল করছে এবং হঠাৎ থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। এ কারণে এসব যান নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।’’ তিনি বলেন, ‘‘অটোরিকশা প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেলেও সিটি করপোরেশন কোনও লিখিত নির্দেশনা এখনও পায়নি।’’
জহিরুল ইসলাম বলেন, “অটোরিকশাগুলো আনরেজিস্টারড। এদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনও বিধিমালা এখনও সরকার চূড়ান্ত করেনি। বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় আমরা কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিতে পারছি না।’’
তার মতে, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু সিটি করপোরেশনের একার সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘‘সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অটোরিকশার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সেখানে অন্য বিষয় নিয়েও আলোচনা থাকায় এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।’’
তিনি বলেন, ‘‘উচ্চপর্যায়ের পরবর্তী বৈঠকে অটোরিকশার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সিদ্ধান্ত হলে ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে।’’
ডিএমপির ট্রাফিকের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘‘প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল আগেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু জনবল সংকট ও ডাম্পিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।’’ তারপরও ট্রাফিক বিভাগ প্রতিদিন অভিযান চালাচ্ছে এবং প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক অটোরিকশা ডাম্পিংয়ে পাঠানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আনিসুর রহমান বলেন, ‘‘পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযানের পরিধি বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও সরাসরি ও চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে বিষয়টি নিয়ে নীতিগতভাবে ভাবা হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘প্রধান সড়কে চলাচল বন্ধ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এসব যানকে নিবন্ধন, নীতিমালা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। চালক, মালিক ও যানবাহন শনাক্তে কিউআর কোড বা অন্য কোনও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।’’
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘‘মূল সড়কগুলো যানজটমুক্ত রাখতে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব যান মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে চলছে। তাই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত জরুরি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।’’ তার দাবি, ঢাকায় এসব যান চার্জ দিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। যার একটি অংশ আসে অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুৎ চুরির মাধ্যমে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্বও হারাচ্ছে।
সমাধানের জন্য ড. হাদিউজ্জামান কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলেন। প্রথমত, নতুন করে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটোরিকশা রাস্তায় নামা বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসব যান তৈরির অবৈধ ওয়ার্কশপ ও যন্ত্রাংশের অবাধ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ চার্জিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তার মতে, বর্তমানে চলাচলরত অটোরিকশাগুলোকে ধাপে ধাপে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ডের আওতায় আনতে হবে। এ প্রক্রিয়া কার্যকর হলে অনেক অনুপযুক্ত ও অবৈধ যান স্বাভাবিকভাবেই সড়ক থেকে বাদ পড়বে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত