শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:১৪ পিএম, ২০২৬-০৭-০৪
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়াতে আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল কিনছে সরকার। দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে ৯০ দিনের মজুত সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি)।
সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ এ জ্বালানি সরবরাহ করবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বরাত দিয়ে বাসস জানিয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ জ্বালানি তেল কিনছে। সম্প্রতি বিপিসির এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বাসসকে বলেন, ‘সরকার সাধারণত প্রতি ছয় মাস পর পর দেশের চাহিদার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেল ও জেট ফুয়েল আমদানি করে। এ কারণে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসের চাহিদার বিপরীতে বিপিসি একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে সেটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কমিটি ইতোমধ্যেই অনুমোদন দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসনিক ছাড়পত্র দিয়ে সেটি বিপিসির কাছে পাঠিয়েছি। এখন পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে বিপিসি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেবে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করবে।’
বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা, শিল্প উৎপাদন, কৃষিকাজ এবং আকাশপথের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখাকে বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বাসসকে বলেন, ‘গত ১০ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যার চিঠি ১৭ জুন পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া ইস্যু করা হয়েছে। এখন চূড়ান্ত চুক্তির পর খুব দ্রুতই তেল সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৬০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত সক্ষমতা নিশ্চিত করা। চাহিদা মেটাতে প্রতি ছয় মাস পর পর নিয়মিত তেল আমদানি করা হবে।’
আর্থিক ব্যয় ও ডলারের হিসাব
গত ২৪ মে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির এক প্রস্তাবে বলা হয়, জুন-আগস্ট সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দরপত্রে পরিমাণ কিছুটা কম-বেশি রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের গত ১৩ মে তারিখের ডলারের বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৩.২৫ টাকা) অনুযায়ী এ আমদানিতে সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ কোটি ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ আমদানির অর্থ বিপিসির নিজস্ব তহবিল এবং প্রয়োজনে ঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব
বিপিসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া দাবি করছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ডিজেলের সর্বোচ্চ দর প্রতি ব্যারেল ১৭৮ দশমিক ৯১ ডলার থাকলেও, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল তা ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছায়। গত ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের গড় দর ছিল ৮৫ দশমিক ৯৯৭ ডলার, যা এপ্রিলে বেড়ে ১৮৭ দশমিক ৯০৪ ডলারে দাঁড়ায়।
বিপিসির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির মতে, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রিমিয়াম কিছুটা বাড়লেও আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পাওয়া দর বর্তমান পরিস্থিতিতে যৌক্তিক।
দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনও ঘাটতি নেই। আগামী ৬০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো মজুত রয়েছে। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই। যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইনে কোনও ধরনের বাধা বা সংকটের আশঙ্কা নেই।’
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণে একটি স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত