গড়াই নদী খনন প্রকল্পে হদিস নেই ৩৫০ কোটি টাকার বালির

Passenger Voice    |    ০৪:০০ পিএম, ২০২৬-০৭-০২


গড়াই নদী খনন প্রকল্পে হদিস নেই ৩৫০ কোটি টাকার বালির

কুষ্টিয়ার গড়াই নদী খনন প্রকল্পে সরকারি হিসাবে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ বালির বড় একটি অংশেরই বাস্তব অস্তিত্ব মিলছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে উত্তোলিত অন্তত ৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার বালির হিসাব নেই, যার সরকারি মূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। তবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হলে এর বাজারমূল্য আরো অনেক বেশি হতে পারত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৭ সাল থেকে চার ধাপে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হয় গড়াই নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশ। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পে নদীর তলদেশ থেকে ৪ কোটি ১৭ লাখ ঘনমিটার বালি উত্তোলন করে ১০টি মৌজায় সংরক্ষণ করা হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উত্তোলিত বালির মধ্যে মাত্র ১৭ লাখ ঘনমিটার বিক্রি হয় টেন্ডারের মাধ্যমে। বর্তমানে ছয়টি মৌজায় প্রায় ৬০ লাখ ঘনমিটার বালি রয়েছে। তবে বাকি প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার বালির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, আগের তিন ধাপের প্রকল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি বর্তমানে কুষ্টিয়া কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ওই ধাপগুলোর বালিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি করা হয়নি। ফলে বিপুল পরিমাণ বালি কোথায় গেল, সে বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, স্থানীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এবং অসাধু চক্র প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংরক্ষিত বালি অবৈধভাবে সরিয়ে নিয়েছে। তাদের দাবি, অতীতের সরকার আমলে যেভাবে প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে বালি উত্তোলন ও পাচারের অভিযোগ ছিল, সরকার পরিবর্তনের পরও একই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় বদলেছে, কিন্তু অনিয়মের ধরন বদলায়নি।

পাউবোর কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, সংরক্ষিত বালি রক্ষায় একাধিকবার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেয়া হলেও কার্যকরভাবে অবৈধ উত্তোলন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, প্রশাসনিক সমন্বয়ের দুর্বলতা ও কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কেউই নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এদিকে সম্প্রতি একটি ইজারাদার প্রতিষ্ঠান লিখিতভাবে জানিয়েছে, যেসব মৌজা থেকে বালি উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, সেখানে বাস্তবে পর্যাপ্ত বালি পাওয়া যায়নি। এতে সরকারি নথি ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অবস্থার মধ্যে বড় ধরনের অসংগতির বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গড়াই নদী খনন প্রকল্পের বালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত, পূর্ণাঙ্গ অডিট ও দায় নিরূপণ জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে খননকাজ থেকে উত্তোলিত বালির ডিজিটাল হিসাব সংরক্ষণ, জিপিএস-ভিত্তিক নজরদারি, নিয়মিত নিরীক্ষা ও স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একই ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল কুষ্টিয়া চ্যাপ্টারের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তন হলেও বালি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অতীতের মতো এখনো বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।’