দ্রুত কমছে ২৪ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ

Passenger Voice    |    ১২:৪৮ পিএম, ২০২৬-০৭-০১


দ্রুত কমছে ২৪ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ

খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংক খাতে সুখবর দিচ্ছে ২৪ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের এই ২৪ ব্যাংকে দ্রুত কমছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। এর মধ্যেও ২৪ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে এক বছরের ব্যবধানে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকায়।অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমেছে ৮২১ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, ‘গত এক বছরে আমরা প্রচুর পরিমাণ ঋণ পুনঃ তফসিল করেছি। কারণ যেসব কম্পানি দীর্ঘদিন ব্যবসা করতে পারেনি তারা একটু সাপোর্ট পেলেই ঘুরে দাঁড়াবে। এমন প্রতিষ্ঠান বাছাই করে তাদের পূর্বের ঋণ পুনঃ তফসিল করেছি এবং প্রয়োজনে ছোট আকারের নতুন ঋণও দিয়েছি।

ফলে ব্যাংকের খেলাপিও কমেছে। ওই কম্পানিও চালু হয়েছে। যার মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালের মার্চে ছিল আট হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে দাঁড়ায় আট হাজার ২৬৬ কোটি টাকায়। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা থেকে কমে ১৬ হাজার ২৪৩ কোটিতে নেমেছে।

এ ছাড়া অন্যান্য ব্যাংকর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া পিএলসির খেলাপি ঋণ চার হাজার ৫৫ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ১২৯ কোটিতে নেমেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের এক হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। ঢাকা ব্যাংকের দুই হাজার ৯০ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৩৯১ কোটি টাকা হয়েছে।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের তিন হাজার ২১০ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ৪২৭ কোটি টাকা হয়েছে। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৬৬৫ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৩২ কোটি টাকা। যমুনা ব্যাংকে এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ৬২৬ কোটি টাকা। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দুই হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৩৬৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২৯৬ কোটি টাকা। মধুমতি ব্যাংকের ৬৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ২২৬ কোটি টাকা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক দুই হাজার ৫৮২ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ২৭ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা থেকে কমে ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। এনসিসি ব্যাংকের এক হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ১২৩ কোটি টাকা।

এই তালিকায় আরো রয়েছে এনআরবি ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ এক হাজার ২৬৪ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৭৮ কোটি টাকায় নেমেছে। ওয়ান ব্যাংকের তিন হাজার ২০৯ কোটি টাকা থেকে কমে তিন হাজার চার কোটি টাকা। প্রাইম ব্যাংকের এক হাজার ৪২১ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৯২ কোটি টাকা। পূবালী ব্যাংক পিএলসির দুই হাজার ৬০১ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এক হাজার ৮২৯ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার  ৪৫৮ কোটি টাকা। সাউথইস্ট ব্যাংক তিন হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংক দুই হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। ট্রাস্ট ব্যাংক দুই হাজার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ১৮ কোটি টাকা এবং উত্তরা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক হাজার ২৬৫ কোটি টাকা থেকে সামান্য কমে এক হাজার ২১৫ কোটি টাকা হয়েছে।

অবশ্য ব্যাংকাররা বলছেন, খেলাপি ঋণ কমার প্রধান কারণ প্রকৃত অর্থে আদায় বৃদ্ধি নয়, বরং ঋণ পুনঃ তফসিল। স্বল্প ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়ায় কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমেছে। ফলে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এসব ঋণ আবার খেলাপি হয়ে যেতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে নানা বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধাক্কা লেগেছে। করোনা মহামারি, ওমিক্রন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানিসংকটে এশিয়ার প্রায় সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তাঁরা। অনেকের মতে, এই সহায়তা ছাড়া অর্থনীতিকে সচল রাখা কঠিন হতো।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাঁদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরো গভীর হতে পারে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঋণ পুনঃ তফসিলের একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে বলা হয়, মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করতে পারবেন গ্রাহক। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আবেদনের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি ডাউন পেমেন্ট ২ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে।

এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, যাঁরা বিভিন্ন কারণে ব্যবসা করতে না পেরে ঋণ খেলাপি হয়েছেন, তাঁদের সুবিধা দেওয়া উচিত; যেন তাঁরা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আর যাঁরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা ভালো গ্রাহকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমলেও এগুলো আবার খেলাপি হয়ে পড়বে।