শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১২ এএম, ২০২৬-০৭-০১
সরকারি প্রকল্পে শত শত দরিদ্র শ্রমিকের কাজ করার কথা। কিন্তু মাঠে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। শ্রমিকের বদলে চলছে ভেকু (এক্সক্যাভেটর) মেশিন। আর তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে ব্ল্যাংক চেকে আগাম সই নেওয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের দবরদস্তা-মলঙ্গী খাল পুনর্খনন প্রকল্পে। বিষয়টি তদন্তের দাবিতে স্থানীয়রা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের বিভিন্ন অংশে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে ৫৯৫ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা। কিন্তু মাঠে তাদের উপস্থিতি মেলেনি। খালের পাশে দেখা যায় মাত্র কয়েকজন তদারককারীকে। জানা গেছে, শ্রমিকদের কাছ থেকে ব্যাংকের চেকে অগ্রিম সই নিয়েছেন প্রকল্প কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। কাজের তদারকিতে থাকা মুন্না মিয়া বলেন, ‘আমরা তিনজন এখানে কাজ করি। প্রতিদিন ৮০০ টাকা করে পাই। সরকারি তালিকাভুক্ত শ্রমিক এখানে কাজ করেন না।’
স্থানীয় কৃষিশ্রমিক মোফাজ্জল হোসেনের অভিযোগ, এলাকার শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। পরে চেক বইয়ের খালি পাতায় সই করিয়ে সেই চেক নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। একই অভিযোগ করেন প্রকল্পের তালিকাভুক্ত শ্রমিক হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে শুধু সেদিন আমাদের ডাকা হয়। দুই-তিন দিনের বেশি কাজ করিনি। আমার কাছ থেকে খালি চেকে সই নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত মাত্র এক হাজার টাকা পেয়েছি।’ স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দেড় মাস ধরে অধিকাংশ খননকাজ ভেকু মেশিনেই করা হচ্ছে। খালের বিভিন্ন স্থানে এখনো পানি জমে থাকায় প্রকৃত তলদেশ কতটা খনন হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে খাল খনন, পুনর্খনন ও সংস্কারকাজে ৪২০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৬৩ জেলার ২৪৯ উপজেলায় ৩৭৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ফুলবাড়িয়ার দবরদস্তা-মলঙ্গী খাল পুনর্খনন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৫ টাকা। ১০ কিলোমিটার খাল পুনর্খননের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ, বক্স কালভার্ট ও আরসিসি পাইপ নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল প্রকল্পটির উদ্বোধনের সময় জানানো হয়েছিল, খাল পুনর্খননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূর হবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং শত শত অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই কর্মসংস্থানের বদলে মেশিননির্ভর কাজ চলায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
প্রকল্প কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ৫৯৫ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ জন কাজ করেন। তবে শ্রমিকদের ব্যাংক চেকে আগাম সই নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. সাইদুল হক বলেন, নিয়ম মেনেই ভেকু মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্রমিকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। বিল দেওয়ার আগে সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। অন্যদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, প্রকল্পের কাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজ এখনো চলমান।
সরকারের উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়া। কিন্তু যদি শ্রমিকের জায়গা দখল করে নেয় মেশিন, আর শ্রমিকদের নামে ব্ল্যাংক চেকে সই নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে শুধু একটি প্রকল্প নয়, সরকারি কর্মসংস্থান কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত