চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করার চেষ্টায় বরখাস্ত থাকা ওয়াজেদ হোসেন

যশোর বিআরটিএতে মোটরযান রেজিষ্ট্রেশনে তৈরি সন জালিয়াতি

Passenger Voice    |    ০৪:১৩ পিএম, ২০২৬-০৬-৩০


যশোর বিআরটিএতে মোটরযান রেজিষ্ট্রেশনে তৈরি সন জালিয়াতি

নিজস্ব প্রতিবেদক-ঢাকাঃ গণপরিবহন সেক্টরের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ। এক সময়ে দালালদের আঁতুড়ঘর ছিল সংস্থাটি। তবে বর্তমানে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করে বাহিরের দালাল নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলেও কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষমতার দাপট নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বিআরটিএ। এবার দুর্নীতির নতুন ফাঁদ মোটরযানের তৈরি সন পরিবর্তন। এমন চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি করেছেন সংস্থাটির যশোর সার্কেলের সাবেক সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এ এস এম ওয়াজেদ হোসেন।  

প্যাসেঞ্জার ভয়েসের অনুসন্ধান বলছে, মোটরযানের তৈরি সন একটি মৌলিক রেজিস্ট্রেশন তথ্য, যা আমদানি বৈধতা, কর নির্ধারণ, মূল্যমান, ফিটনেস, পুনঃবিক্রয় মূল্য এবং আইনগত পরিচয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্ক যুক্ত। কোন ব্যক্তি বা মোটরসাইকেল বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে অবৈধ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল রেকর্ড তৈরি করে পুরোনো গাড়িকে কাগজে নতুন মডেল হিসেবে প্রদর্শনের মাধ্যমে গাড়ির বাজারমূল্য বৃদ্ধি, আমদানি সীমাবদ্ধতা এড়ানো বা প্রতারণামূলক বিক্রয় সহজ করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা নতুন এই ফাঁদ তৈরি করেছে।  

২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর বিআরটিএ প্রশাসন বিভাগ নম্বর-৩৫.০৩.০০০০.০০১.১৯.১৭৬.২৪-১৯৮১ নং স্মারকমূলে এ এস এম ওয়াজেদ হোসেন (পরিচিতি নং- ২০০৬২০০০২৭) সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ)কে বিআরটিএ ময়মনসিংহ সার্কেল থেকে যশোর সার্কেলে বদলি করা হয়। একই সাথে দেয়া হয় নড়াইল সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এর অতিরিক্ত দায়িত্ব। যোগদানের পর থেকে যশোর সার্কেলে দুর্নীতির এই নতুন ফাঁদ চালু করেন তিনি। 

বিআরটিএ যশোর সার্কেলের তথ্য বলছে, যশোর-ল-১৬-৭৯৪৩, যশোর-ল-১৬-৭৮১৭, যশোর-ল-১৬-৭৭৮৪, যশোর-ল-১৬-৭৭২৬, যশোর-ল-১৬-৭৭২৭, যশোর-ল-১৬-৭৭২৮, যশোর-ল-১৬-৭০৩৮, যশোর-ল-১৬-৭০৪৯, যশোর-ল-১৬-৭০৬৮, যশোর-ল-১৬-৭১৬৮, যশোর-ল-১৬-৭১৭৯, যশোর-ল-১৬-৭২৪৩, যশোর-ল-১৬-৭২৪২, যশোর-ল-১৬-৭২৪৪, যশোর-ল-১৬-৭২৪৫, যশোর-ল-১৬-৭২৮১, যশোর-ল-১৬-৭২৮৭, যশোর-ল-১৬-৭৩৪৮, যশোর-ল-১৬-৭৪৯৫, যশোর-ল-১৬-৭৬১৬, যশোর-ল-১৬-৭৬৫৭, যশোর-ল-১৬-৭৯৪৩ নাম্বার গুলো ইস্যু করার সময় মোটরসাইকেলের তৈরি সন ১ বছর অথবা ২ বছর বাড়ানো হয়েছে। যেমন যশোর-ল-১৬-৭৩৪৮ নিবন্ধিত গাড়িটির তৈরি সন ছিল ২০২১ পরবর্তীতে সেটাকে ২০২৩ দেখিয়ে নিবন্ধন প্রদান করা হয়েছে। 

এছাড়াও   যশোর-ল-১৬-৭০৫০, যশোর-ল-১৬-৭২৮৬, যশোর-ল-১৬-৭২৪০, যশোর-ল-১৬-৭২৩৯, যশোর-ল-১৬-৭২০৫, যশোর-ল-১৬-৭২০৪, যশোর-ল-১৬-৭২০২, যশোর-ল-১৬-৭১৯৯, যশোর-ল-১৬-৭১৯৬, যশোর-ল-১৬-৭১৯৪, যশোর-ল-১৬-৭১৯১, যশোর-ল-১৬-৭২৪১, যশোর-ল-১৬-৭২৬০, যশোর-ল-১৬-৭২৪৭, যশোর-ল-১৬-৭৩০৩, যশোর-ল-১৬-৭৩৩০, যশোর-ল-১৬-৭৩৩৫, যশোর-ল-১৬-৭৩৩৮, যশোর-ল-১৬-৭৪৪৬, যশোর-ল-১৬-৭৪৭৪, যশোর-ল-১৬-৭৪৭৩, যশোর-ল-১৬-৭৪৭০, যশোর-ল-১৬-৭৪৫৮, যশোর-ল-১৬-৭৪৪১, যশোর-ল-১৬-৭৪২৭, যশোর-ল-১৬-৭৩৮৩, যশোর-ল-১৬-৭৩৫৮, যশোর-ল-১৬-৭৪৯৮ এই গাড়ি গুলোর প্রকৃত তৈরি সন ২০২৪ হওয়ার পরেও এই সব মোটরসাইকেল নিবন্ধন প্রদানের সময় তৈরি সন ২০২৫ প্রদান করেছেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এ এস এম ওয়াজেদ হোসাইন। প্রতিটি মোটরসাইকেল নিবন্ধনে স্বাভাবিক সময়ে ডিলার ও দালালদের কাছ থেকে গাড়ি প্রতি ১ হাজার টাকা করে ঘুষ গ্রহণ করে এই সার্কেল অফিস। তৈরি সন পরিবর্তন করতে হলে সেক্ষেত্রে প্রতিটি মোটরসাইকেল নিবন্ধনে ৪ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত ঘুষ প্রদান করতে হয়। 

প্যাসেঞ্জার ভয়েস যেভাবে অনুসন্ধান করেছেঃ যশোর সার্কেলের একটি মোটরসাইকেল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সেজে সার্কেল অফিসের ভিতরে কম্পিউটার অপারেটর পদে দায়িত্বে থাকা বহিরাগত দালাল রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিকের সাথে যোগাযোগ করে প্যাসেঞ্জার ভয়েস। আলাপকালে জানা যায় রফিক এর আগে  নিবন্ধন ফাইলের বিল অব এন্টিতে তৈরি সন ২০২৩ রয়েছে এবং ২০২৩ সালে নিবন্ধন ফি জমা দেয়া আছে এমন ২২ টি মোটরসাইকেল ২০২৪ মডেল দেখিয়ে গাড়ি প্রতি ৪ হাজার টাকা করে ঘুষ দিয়ে যশোর সার্কেল থেকে নিবন্ধন করিয়ে দিয়েছে। 

বিষয়টি আরো গভীরে অনুসন্ধান করে প্যাসেঞ্জার ভয়েস জানতে পারে, উল্লেখিত বাকী ২৮ টি মোটরসাইকেলের তৈরি সন ২০২৫ সাল হওয়ায় মোটরসাইকেলগুলোর চ্যাসিস যাচাই করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, RMBL-ED13F-148832 নং চ্যাসিসটি যশোর সার্কেলের নিবন্ধন প্রদান করে যার রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার যশোর-ল-১৬-৭০৫০। একই ভাবে RMBL-ED13F-148834 নং চ্যাসিসটি ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল অফিস নিবন্ধন প্রদান করে, রেজিষ্ট্রেশন নং- ঢাকা মেট্রো-ল- ৬৪-৩৪৫১। গাড়িটির তৈরি সন ২০২৪। তথ্য নিয়ে জানা যায় ২০২৪ সালের একই তারিখে গাড়িগুলো বাংলাদেশে আমদানী হয় ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল তৈরি সন সঠিক প্রদান করলেও যশোর সার্কেলে ঘুষের বিনিময়ে তৈরি সন ২০২৫ সাল করা হয়েছে। একই ভাবে যশোর সার্কেলে নিবন্ধিত RMBL-ED13F-157429, PS2RG82200A006722, PSUA11CY8RTK31355, PS2RG64100A145039, PS2RG64100A137167, RMBL-NG4BW-213601 এইসব চ্যাসিসে তৈরি সন ২০২৫, অন্যদিকে একই দিনে আমদানি হওয়া ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলে নিবন্ধিত RMBL-ED13F-157428, PS2RG82200A006723, PSUA11CY8RTK31354, PS2RG64100A145042, PS2RG64100A137165, RMBL-NG4BW-213608 এইসব চ্যাসিসের তৈরি সন ২০২৪। 

এর আগে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর “চ্যাসিস বিক্রি ও বডি তৈরীর আগে ময়মনসিংহ বিআরটিএতে ঘুষে মেলে স্লিপার বাসের নিবন্ধন” শিরোনামে বিআরটিএ ময়মনসিংহ সার্কেলে জুলাই-অক্টোবর ২০২৪ সময়কালে কর্মরত সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এ এস এম ওয়াজেদ হোসেন এর বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ স্লিপার বাস নিবন্ধনের সংবাদ প্রকাশ করেছিল   প্যাসেঞ্জার ভয়েস। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পরে সংস্থাটির নিজস্ব তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারী নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.২৭.০১১৯.২৫-১১২ সংখ্যক স্মারকে সরকারী কাজে অনিয়ম সৃষ্টি করা, কর্তব্য কর্মে চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে নিয়ম বর্হিভুতভাবে রেজিষ্ট্রেশন প্রদান করার দায়ে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে সংস্থাটি । 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সারাদেশে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন হয়েছে ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ৭৪৭ টি। এর মধ্যে ২০২৬ সালের চলতি মাস নাগাদ ঢাকা শহরে মোট নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ১৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৪টি। পরিসংখ্যান বলছে সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৮০৫ টি নতুন মোটরসাইকেল এই বহরে যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশের মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মোটরযানের নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা ও বৈধতা নিশ্চিত করা বিআরটিএ’র আইনগত দায়িত্ব। এই আইনের অধীনে নিবন্ধিত তথ্য অনুমোদনহীনভাবে পরিবর্তন, বিকৃত বা অসত্য তথ্য প্রদান আইন বিরোধী। কোনো বিআরটিএ কর্মকর্তা যদি আইনগত যাচাই ছাড়া, বিধিবহির্ভূতভাবে বা অসৎ উদ্দেশ্যে মোটরযানের Model Year পরিবর্তন করেন, তাহলে তিনি আইন দ্বারা অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন এবং সরকারি কর্তব্যের প্রতি অসততা প্রদর্শন করেন। এটি প্রশাসনিক ন্যায়নীতি, transparency এবং accountability নীতিরও লঙ্ঘন। 

আইন বলছে, বিআরটিএর কোন কর্মকর্তা যদি জেনে-শুনে কোনো মোটরযানের তৈরি সন পরিবর্তন করেন, অথবা প্রকৃত তথ্য গোপন করে সরকারি database, registration certificate কিংবা ডিজিটাল রেকর্ডে ভিন্ন তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে তাহলে এ ধরনের কর্মকান্ড প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং সরকারি নথি জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদাচরণ, প্রতারণায় সহায়তা এবং দুর্নীতিমূলক কর্মকান্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ মোটরযানের তৈরি সন একটি মৌলিক রেজিষ্ট্রেশন তথ্য, যা আমদানি বৈধতা, কর নির্ধারণ, মূল্যমান, ফিটনেস, পুনঃবিক্রয় মূল্য এবং আইনগত পরিচয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে এই তথ্য পরিবর্তন করা রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থার সততা বিনষ্ট করার সামিল। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী এই রকম অপরাধের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা, ইনক্রিমেন্ট স্থগিত, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতি পর্যন্ত করতে পারে। একইসাথে ফৌজদারি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদন্ড ও অর্থদন্ড হতে পারে।

এদিকে এইসব মোটরসাইকেলের তৈরি সন পরিবর্তনের জন্য গাড়িপ্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছে সংস্থাটির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কতিপয় গ্রাহককে অবৈধ সুবিধা প্রদান, আইনগত দায় থেকে রক্ষা করা বা প্রতারণামূলক সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল রেকর্ড তৈরি করে পুরোনো গাড়িকে কাগজে নতুন মডেল হিসেবে প্রদর্শনের মাধ্যমে গাড়ির বাজারমূল্য বৃদ্ধি, আমদানি সীমাবদ্ধতা এড়ানো বা প্রতারণামূলক বিক্রয় সহজ করেছেন এই কর্মকর্তা।  

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী ঘুষ নিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে অবৈধ সুবিধা প্রদান ও রাষ্ট্রীয় রেকর্ড বিকৃত করা criminal misconduct । বিআরটিএ’র registration database, smart card data বা registration certificate-এ ভুয়া তৈরি সন অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি দলিল জালিয়াতি এবং জাল নথি ব্যবহার বা কার্যকর করার অপরাধ। কারণ পরিবর্তিত তৈরি সন পরবর্তীতে গাড়ি বিক্রয়, ব্যাংক ফাইন্যান্স, বীমা বা আমদানি বৈধতা প্রদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।