প্রাণঘাতী দাবদাহ, যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করল ফ্রান্স

Passenger Voice    |    ০২:৩৫ পিএম, ২০২৬-০৬-২৯


প্রাণঘাতী দাবদাহ, যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করল ফ্রান্স

ফ্রান্সে রেকর্ড ভাঙা তীব্র দাবদাহে অন্তত ১ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যেই ফ্রান্সে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) না থাকা নিয়ে মার্কিন পর্যটক ও নাগরিকদের উপহাসের জবাবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্যারিসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এই দাবদাহ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আংশিক দায়ী করেছেন।

ফ্রান্সে পর্যাপ্ত এসি না থাকায় তীব্র সমালোচনা ও উপহাস করছিলেন মার্কিন পর্যটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সাররা। এর জবাবে তাদের কড়া সমালোচনা করেছেন প্যারিসের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক ডেপুটি মেয়র অড্রে পুলভার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, 'প্রিয় মার্কিন সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের "ইনফ্লুয়েন্সাররা": বেশ কয়েক দিন ধরে আপনাদের কেউ কেউ প্যারিসের সমালোচনা করছেন এবং উপহাস করছেন কারণ এ শহরের প্রতিটি ঘরে এসি নেই... ওহ মাই গড, এটি সত্যিই হাস্যকর!'

যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী করে তিনি আরও লেখেন, 'বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এর ফলে ফ্রান্সে আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি, তার জন্য আপনাদের অনেক বড় দায় রয়েছে। আপনাদের শহরগুলোর ৯০ শতাংশ জায়গায় যে এসি ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে এই দাবদাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।'

প্যারিসের পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগের তালিকা তুলে ধরে পুলভার তার পোস্টের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে লেখেন, 'দয়া করে আপনাদের এই উপদেশ দেওয়া বন্ধ করুন। আগে নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করুন। শুভকামনা।'

যুক্তরাষ্ট্রের মতো ফ্রান্সে এসি ব্যবহার করা খুব একটা সাধারণ বিষয় নয়। দেশটিতে মাত্র চার ভাগের এক ভাগ পরিবারে এসি রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই ফরাসিরা এসি ব্যবহারের বিপক্ষে। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত ইপসোস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ ফরাসি নাগরিক মনে করেন এসি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি প্রতি ছয়জন উত্তরদাতার মধ্যে একজন জানিয়েছেন, পৃথিবীর পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে তাঁরা দাবদাহের কষ্ট সহ্য করতেও রাজি আছেন।

তবে গত সপ্তাহের রেকর্ড ভাঙা তীব্র তাপমাত্রা ফরাসিদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। দেশজুড়ে পোর্টেবল বা বহনযোগ্য এসি কেনার ধুম পড়েছে এবং দোকানগুলোতে লম্বা লাইনের সৃষ্টি হয়েছে।

ফ্রান্সের পাবলিক হেলথ বিভাগ রোববার এক প্রাথমিক তথ্যে জানিয়েছে, গত বুধবার দাবদাহের তীব্রতা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশটিতে সাধারণ সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে বাড়িতে মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট ফরাসি সংবাদমাধ্যম 'লা ট্রিবুন'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেন, তীব্র দাবদাহের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, 'গত কয়েক দিনের তীব্র গরমের একটি বিলম্বিত প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এবং তরুণদের ওপর। অনেক সময় দাবদাহ শেষ হওয়ার ৫ থেকে ১০ দিন পরও রোগীরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছেন।' তিনি আরও জানান, ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফলে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।

প্যারিসে জরুরি সেবা বিভাগে গত শুক্রবার শেষ হওয়া ২৪ ঘণ্টায় ৩,৪০০টি কল এসেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে চার গুণ বেশি। এই সময়ের মধ্যে ৩০ জন হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসের পশ্চিমে ইভলিন বিভাগে গত শুক্রবার হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। তবে তার ১৫ বছর বয়সী ভাইকে প্যারামেডিকরা বাঁচাতে সক্ষম হয়েছেন। তীব্র গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে এ পর্যন্ত ৭৪ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে প্যারিসের কানাল সেন্ট-মার্টিনে সাঁতার কাটার নিষিদ্ধ এলাকায় ডুবে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

তীব্র গরমে অতিষ্ঠ প্যারিসের অনেক বাসিন্দাকে তাঁদের গরম হয়ে যাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বাট-শমঁ-এর মতো পার্কের সবুজ ঘাসে রাত কাটাতে দেখা গেছে। অনেকে এসিযুক্ত স্থানীয় হোটেলে রুম বুক করেছেন।

রোববার রাতে বজ্রঝড় প্যারিসের তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনলেও বজ্রপাতের ফলে আইসিন, ইভলিন এবং ইন্দ্র-এ-লোয়ার বিভাগে ৩৬,০০০ পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, প্যারিসের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শনিবার থেকে ৩০ ঘণ্টা ধরে ১,৩০০ পরিবার বিদ্যুৎহীন রয়েছে। এর ফলে বহুতল ভবনের লিফট, ফ্রিজ ও ফ্যান বন্ধ হয়ে বিপত্তি আরও বেড়েছে।

প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট বলেন, 'যদি আপনার প্রতিবেশী একা থেকে থাকেন, তবে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ার এখনও সময় আছে। আমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব নিতে হবে।'