নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিয়ম না মেনেই গাড়ি কেনার ঋণ

Passenger Voice    |    ১০:৩৪ এএম, ২০২৬-০৬-২৯


নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিয়ম না মেনেই গাড়ি কেনার ঋণ

গত অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। তহবিল সংকটে ঋণ চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নতুন করে চাওয়া হয়েছে চার হাজার কোটি টাকার তহবিল। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে দেওয়া হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। আর রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে দেওয়া হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এসব অনিয়ম ঘটেছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে।

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার চাপে গোপনে ‘নির্বাহী কার লোন স্কিম নীতিমালা’ তৈরি করে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। নীতিমালার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ব্যাংকটিতে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদের নিচে গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন ছিল না। কিন্তু ওই নীতিমালা অনুযায়ী এজিএম ও ডিজিএম পদের জন্য ঋণ দেওয়া হয়। 

অর্থ মন্ত্রণালয় এই অনিয়ম জানার পর গত বছরের ১৬ নভেম্বর চিঠি দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে  গাড়ি ঋণ নীতিমালা বাতিলের নির্দেশ দেয়। এরপরও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মাসে ৪২ হাজার টাকা এবং উপমহাব্যবস্থাপককে (ডিজিএম) ৪৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা করে গাড়ির ঋণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পেতেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর চাপের মুখে ঢালাও পদোন্নতি নেওয়া হয়। যে কারণে এসব ব্যাংকে নতুন করে গাড়ির ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা বন্ধ রেখেছে সরকার। রাষ্ট্রীয় এসব বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাইরে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাকাব এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত প্রবাসী কল্যাণ, হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের জিএমের নিচের কর্মকর্তারা নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি সুবিধা পান না। 

জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম বলেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে গাড়ি ঋণের নীতিমালা জারি করা হয়। নীতিমালার আলোকে সহকারী মহাব্যবস্থাপক বা সমমান (গ্রেড-৪) হতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদমর্যাদা সম্পন্ন স্থায়ী কর্মকর্তারা গাড়ির ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা পেয়ে থাকেন। তিনি স্বীকার করেন, এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। গত বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠির পরই পর্ষদ থেকে নতুন করে গাড়ি ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে যারা ইতোমধ্যে গাড়ি কিনেছেন, তাদের রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত দেয় পর্ষদ।

কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ যেতে আগ্রহীদের ঋণ সহায়তা, দেশে ফেরার পর কর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পন্থায় রেমিট্যান্স আনতে দেড় দশক আগে কার্যক্রম শুরু করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। ২০১৮ সালে তপশিলি ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্তির অনুমোদন পেলেও আজ পর্যন্ত তা করতে পারেনি। রেমিট্যান্স আনা দূরে থাক, নিজেদের ঋণের কিস্তিও সরাসরি আদায় করতে পারে না তারা। মূলত কোর ব্যাংকিং সলিউশন না থাকায় অন্য ব্যাংকের সহায়তায় কার্যক্রম চালাতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তঃব্যাংক লেনদেন প্ল্যাটফর্মেও যুক্ত হতে পারেনি ব্যাংকটি।

জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের পর প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতো বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকও গাড়ির ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দেওয়া শুরু করে। জানতে পেরে গত বছরের ১৬ নভেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এসব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে বলা হয়, সরকারের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া গাড়ি ক্রয় ও অগ্রিম নীতিমালা বাতিল করতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ছাড়া অন্য দুটি ব্যাংক তখন সুবিধা বন্ধ করে দেয়।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গাড়ি সুবিধা নীতিমালা অনুমোদনের এখতিয়ার নেই। এ রকম সুবিধার জন্য অবশ্যই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। তবে গোপনে এরা নিজেদের মতো করে নীতিমালা তৈরি করেছিল। মন্ত্রণালয় জানার পর চিঠি দিয়ে তা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরও ওই নীতিমালার আলোকে গাড়ির ঋণ বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দিলে তা অপরাধ এবং ওই অর্থ ফেরত দিতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মোট ২১ জন এজিএম ও ডিজিএম গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা নিচ্ছেন। ৩০ লাখ টাকা করে ঋণ হিসেবে তাদের দেওয়া হয়েছে ছয় কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর প্রতি মাসে ১৫ জন এজিএম প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে মোট ছয় লাখ ৩০ হাজার টাকা নেন। আর ছয়জন ডিজিএম ৪৫ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে নিচ্ছেন দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর বাইরে রূপালী ব্যাংক থেকে আসা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুল ইউনুস গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা নিচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি নিয়মিতভাবে ব্যাংকের পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন।

সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির আলোকে গত এপ্রিল মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের এক নির্দেশনার মাধ্যমে সব ধরনের গাড়ি কেনা, বিদেশ ভ্রমণ, কম্পিউটার কেনাসহ ১১ ধরনের খরচের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওই পরিপত্র জারি করে অর্থ বিভাগ। ওই নির্দেশনার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ সুবিধাও স্থগিত করা হয়।

কেমন চলছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নিট ৯৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকার লোকসান করেছে। আর নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯০ কোটি টাকা। তহবিল সংকটের কারণে গত এপ্রিল মাসে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চার হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সুবিধার চেয়ে আবেদন করেছে। এ ছাড়া পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন, রেমিট্যান্স আহরণ সুবিধা চালু এবং ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালায় বিশেষ ছাড় চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মোট ঋণ রয়েছে তিন হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। গ্রাহক পর্যায় থেকে ব্যাংকটি কোনো আমানত নিতে পারে না। সরকারের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল সহায়তা নিয়ে পরিচালিত হয়। যে কারণে বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সাধারণভাবে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংকের ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে বিধিবদ্ধ নগদ জমা (সিআরআর) রাখতে হয় ৪ শতাংশ। আর এসএলআর হিসেবে ১৩ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়। এত সব সুবিধার পরও ব্যাংকটি লোকসান করে চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের  তহবিল সংকট মেটাতে আপাতত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য রাখা এক হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া অন্য ব্যাংকের মতো কোর ব্যাংকিং সলিউশন (সিবিএস) স্থাপন এবং আন্তঃব্যাংক লেনদেন চালুর সক্ষমতা অর্জন করতে পারলে পরিপূর্ণ তপশিলি ব্যাংকের কার্যক্রম চালুর সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, ব্যাংকটির সুশাসন জোরদার করা খুব জরুরি।

সৌজন্যে সমকাল