ঢাকা-পাহাড়তলী,লোকোশেড থেকে আরএনবি পর্যন্ত রেলওয়ের দুর্নীতি অরাজকতা

Passenger Voice    |    ১০:৪৬ এএম, ২০২৬-০৬-২৮


ঢাকা-পাহাড়তলী,লোকোশেড থেকে আরএনবি পর্যন্ত রেলওয়ের দুর্নীতি অরাজকতা

রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী–সর্বত্রই যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘উৎসব’ চলছে। ঢাকা ও পাহাড়তলী লোকোশেডে হাজিরা ও মাইলেজ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) আইনের অপব্যবহার, বদলি-বাণিজ্য ও পদোন্নতি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে যন্ত্রাংশ না কিনে বিল উত্তোলন এবং পক্ষপাতমূলক দুর্ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে দায় এড়ানোর ঘটনাগুলো রেলের ভঙ্গুর প্রশাসনিক অবস্থার চিত্রই তুলে ধরছে।রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এবং চট্টগ্রাম (সিআরবি) কার্যালয়ের একাধিক নথি বিশ্লেষণ করে মিলেছে অনিয়মের নানা তথ্য।

লোকোশেডে হাজিরা ও মাইলেজ নিয়ে নৈরাজ্য

সিআরবির পাহাড়তলীর ক্যারিজ অ্যান্ড ওয়াগন শপে হাজিরার বড় ধরনের অনিয়ম সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাহাড়তলী কন্ট্রোলের এক কর্মীর ২৫ থেকে ৩১ মার্চ এবং অন্যজনের ২৮ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোনো হাজিরা স্বাক্ষর বা নৈমিত্তিক ছুটির (সিএল) আবেদন নেই। তবু তারা নিয়মের তোয়াক্কা না করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে মাইলেজ সুবিধা নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (চট্টগ্রাম) ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের (সিওপিএস-পূর্ব) চরম উদাসীনতার কারণে এই বিশৃঙ্খলা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত তিন-চার মাসের কন্ট্রোল চার্ট ও হাজিরার খাতা তদন্ত করলেই এসব জালিয়াতি বেরিয়ে আসবে।

অন্যদিকে ঢাকা লোকোশেডে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই) দেলোয়ার হোসেন। বেশ কয়েকজন শেডম্যান ও উপসহকারী লোকোমাস্টার নিয়মিত কর্মস্থলে না এসেও প্রতি মাসে ৬০ কিলোমিটারের বেশি মাইলেজ তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাইলেজ নীতিমালা অনুযায়ী ‘ফুয়েল স্লিপ টু ফুয়েল স্লিপ’ এবং ‘অন ডিউটি/অফ ডিউটি’ ২ ঘণ্টার বাইরে মাইলেজ নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এই নিয়ম ভেঙে ঢাকা লোকোশেডের কর্মীদের একটি চক্র দুই বছর ধরে ফুয়েল স্লিপ ছাড়াই প্রতি মাসে ৬০ কিলোমিটারের বেশি মাইলেজ নিচ্ছে। এ ধরনের ভুয়া মাইলেজ-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে রেলওয়ের রানিং স্টাফদের। 

রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগীয় শীর্ষস্থানীয় এক নেতা বলেন, ‘এ নিয়ে আমরা সম্প্রতি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (রোলিং স্টক) সভায় আপত্তি জানিয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।’

ঢাকা লোকোশেডের এসএসই দেলোয়ার হোসেন এই অনিয়মের প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢাকা লোকোশেডে দায়িত্বে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে কেউ নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত মাইলেজ সুবিধা নিচ্ছেন না।’ 

ঢাকা বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) মো. সজীব আল হাসানকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি। 

আরএনবিতে আইনের অপব্যবহার ও পদোন্নতি সিন্ডিকেট

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) আইন অমান্য করে চলছে বদলি ও পদোন্নতি-বাণিজ্য। আরএনবি আইন (২০১৬ সালে প্রণীত) অনুযায়ী কোনো অপরাধের বিচার তিন মাসের মধ্যে না হলে সেই ফাইল তামাদি বলে বিবেচিত হয়। চিফ কমান্ড্যান্ট (পূর্ব) জহিরুল ইসলাম এক বছর আগের এক ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। সে সময় দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় সিপাহি আমিনুল ইসলামকে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়। তার পক্ষে সুপারিশ করায় সাদ্দাম নামের আরেক কর্মীর বিরুদ্ধে নানা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আরএনবিতে অস্বস্তি রয়েছে। জানা গেছে, গত এক বছরে জহিরুল ইসলাম কোনো নিয়ম না মেনেই ৭০০-৮০০ কর্মীকে বদলি করেছেন। সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও সিআরবিতে জমা দেননি জহিরুল।

এ ছাড়া অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট মোহাম্মদ সালামত উল্লাহ চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন করে চিফ কমান্ড্যান্টের মৌখিক নির্দেশে প্রশাসনিক আদেশ জারি করছেন। আরএনবি অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ এবং রেলওয়ের সার্ভিস রুলকে অগ্রাহ্য করে তিনি এই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘ ছয় বছর পর নিয়মবহির্ভূতভাবে সাব-ইন্সপেক্টর ইলিয়াস হোসেনকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জহিরুল আলম ও সালামত উল্লাহর বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে জানতে চিফ কমান্ড্যান্ট (পূর্ব) জহিরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কমান্ড্যান্ট (চট্টগ্রাম) মোরশেদ আলম বলেন, ‘আরএনবি চট্টগ্রাম অফিসে আমি জয়েন করেছি কিছুদিন আগে। আরএনবির নিয়োগসংক্রান্ত কোনো জটিলতা হয়েছে কি না, তা আমার জানা নাই। কিন্তু চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে আরএনবিতে জনবল খুব কম। তাতে আমাদের কাজ করতে অনেক সমস্যা হয়।’ 

‘তিন জহির’ বহাল তবিয়তে, জালিয়াতিতে ‘অটল’

ঢাকা লোকোশেডে যন্ত্রাংশের ভুয়া চাহিদা দেখিয়ে মালামাল না কিনেই বিল উত্তোলনের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্টোর মুন্সি জহির, ইনচার্জ জহুরুল ইসলাম ও বর্তমান ওয়ার্কশপ ম্যানেজার (ডব্লিউএম) জহিরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। রেলওয়ের নিজস্ব তদন্তে এই তিন জহিরকে বাঁচাতে কৌশলী রিপোর্ট দেওয়ায় জালিয়াতির পরও তারা এখনো স্বপদে বহাল আছেন। এমনকি জহুরুল ইসলাম মেয়াদ ফোরানোর আগে আবারও ইনচার্জ হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।

দুর্ঘটনা তদন্তে কারসাজি, ক্যারেজ বিভাগকে বাঁচাতে প্রকৌশল বিভাগকে বলি

সিলেট সেকশনে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ট্রেন দুর্ঘটনার তদন্তে চরম অদক্ষতা ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ঢাকা) ও তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্যারেজ বিভাগকে বাঁচাতে একতরফাভাবে প্রকৌশল বিভাগ ও রেললাইনকে দায়ী করেছেন। তবে কারিগরি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আন্ডার গিয়ার ভেঙে না গেলে পয়েন্ট বক্স ছিটকে যাওয়ার সুযোগ নেই, যা তদন্তে চেপে যাওয়া হয়েছে। ৩০০০ সিরিজের এক্সেল লোড সক্ষমতা যাচাই ছাড়াই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ ভিত্তিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে। কন্ট্রোলের জিপিএস ট্র্যাকিং চার্ট এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যা থেকে লোকোমাস্টারের ওভারস্পিডের বিষয়টি প্রমাণিত হতে পারত। সৌজন্যে খবরের কাগজ