শিরোনাম
Passenger Voice | ০৪:৪৮ পিএম, ২০২৬-০৬-২৭
ব্যাংক হিসাব খুলতে বাধ্যতামূলকভাবে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) জমা দেওয়ার যে বিধান নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে তা থেকে সরে আসতে পারে সরকার। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ কর, তৈরি পোশাক খাতের উৎসে কর, কাঁচামাল আমদানির শুল্ক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কর সুবিধাসহ কয়েকটি বিষয় সংশোধনের আলোচনা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিদেশ সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ব্যাংক হিসেবে টিআইএন সনদ নিয়ে বিতর্ক
অর্থমন্ত্রী গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে করজাল সম্প্রসারণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আসা ব্যক্তিদের কর কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ এবং অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন নজরদারিতেও এটি সহায়ক হবে।
তবে বাজেট ঘোষণার পরপরই এ প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে রয়েছে। তাদের অনেকের আয় করযোগ্য নয়, কিন্তু বিভিন্ন প্রয়োজনেই ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে এসব মানুষকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হবে। এ কারণে অনেকেই হয়তো ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকতে আগ্রহী হবেন, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে সরকার এ বিধান পুনর্বিবেচনা করতে পারে। সাধারণ শিক্ষার্থী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী এবং বিশেষ গেজেটপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ছাড় রাখা হলেও সামগ্রিকভাবে এ বিধান নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আর এসব কারণে বিষয়টি শিথিল করা হতে পারে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিসাবধারীর কোনো টিআইএন নেই।
এ বিষয়ে কথা হলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ক্রেডিট কার্ডধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর কার্ড নেওয়ার হার কমে গিয়েছিল। এখন নতুন করে ব্যাংক হিসাবধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যাংক লেনদেনও কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া জানান, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা উদ্বেগ তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে যদি ধারণা তৈরি হয় যে ব্যাংক হিসাব খুললেই অতিরিক্ত জটিলতায় পড়বেন, তাহলে তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর ২০ শতাংশ
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর আরোপ নিয়ে বাজেটে নতুন যে ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে তাও পরিবর্তন হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে কোম্পানির ক্ষেত্রে লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত করহার অনুযায়ী কর দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ হলে সেই হারেই লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর দিতে হতো। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ১২ শতাংশ হলে সেই হার প্রযোজ্য হতো। কিন্তু শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির কারণে সরকার এখন আগের ব্যবস্থাই বহাল রাখার কথা বিবেচনা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন হলে করব্যবস্থায় জটিলতা বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করহার বহাল রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য স্বস্তির খবর
রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য কিছু স্বস্তির খবর আসতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে উৎসে করসংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের আলোচনা চলছে।
উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের বিপরীতে উৎসে করের হার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি আছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্ট মূল্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ দ্বৈত উৎসে কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানির কর-শুল্ক পুনর্বিবেচনা
শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানির ওপর বাজেটে প্রস্তাবিত কর ও শুল্ক কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, কিছু কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ হিসেবে পড়বে। বিশেষ করে প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটে প্লাস্টিক শিল্পের অন্যতম প্রধান দুই কাঁচামাল পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) ও পিইটি (পলিইথিলিন টেরেফথালেট) রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন।
তখন এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ও প্লাস্টিক খাতের উদ্যোক্তা মো. ইউসুফ আশরাফ বলেছিলেন, ‘বাজেটে প্লাস্টিক খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। রপ্তানি পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।’
এ বিষয়ে বিপিজিএমইএর সভাপতি শামিম আহমেদ জাগো নিউজকে জানান, দেশের প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু সেখানে চলমান যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আমদানিও কমে অর্ধেকে নেমে গেছে।
অন্যদিকে তামাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত সম্পূরক শুল্কও সংশোধনের আওতায় আসতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানিতে ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে শুল্কহার সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
অর্থবিল পাসের মাধ্যমে প্রস্তাব হবে চূড়ান্ত
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাজেট প্রণয়নের আগে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ফলে এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। তবে অর্থবিলে কয়েকটি ক্ষেত্রে আংশিক সংশোধন এনে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আগামী ২৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করা হবে। এরপর ৩০ জুন কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১ জুলাই থেকে।
বাজেট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যদিও কিছু প্রস্তাবে পরিবর্তন আসতে পারে, তবে বাজেটের সামগ্রিক কাঠামো, আকার ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকবে। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ও বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য আরও স্পষ্ট ও ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বাজেটে শক্তিশালী লক্ষ্য ও কর্মসূচি থাকলেও এর সফলতা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, স্বচ্ছভাবে প্রণোদনা বিতরণ, বাজার পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নের ওপর।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত