সিন্ডিকেটের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর,প্রতিযোগিতা রুখতে সুপরিকল্পিত ‘খেলা’

Passenger Voice    |    ০৪:০১ পিএম, ২০২৬-০৬-২৪


সিন্ডিকেটের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর,প্রতিযোগিতা রুখতে সুপরিকল্পিত ‘খেলা’

দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর এখন এক গভীর প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক সংকটের আবর্তে। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ সচল রাখা এই বন্দরের বার্থ ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা মুক্তবাজার অর্থনীতি ও স্বচ্ছতার নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন ও দক্ষ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে গুটিকয়েক পুরোনো অপারেটরের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে চলছে এক সুপরিকল্পিত খেলা।

নতুন অপারেটরদের সুযোগ না দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পুরোনো সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লাইসেন্স প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেই কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের টেন্ডার আহ্বান করায় নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত লাইসেন্স স্থগিত ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সিন্ডিকেট আরও বেশি প্রকাশ্যে আসে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর, যখন বন্দর কার্যক্রমে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা আনতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন ‘শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০২৫’ প্রণয়ন করে। একই দিনে নতুন লাইসেন্স প্রদানের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলে দেশের শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান ‘ভার্টেক্স অব-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেডসহ একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠান সব নিয়ম মেনে, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণসহ আবেদন জমা দেয়। কিন্তু নতুনদের এই আগমনী বার্তা হয়তো বন্দরের পুরোনো একচেটিয়া ব্যবসায়ী ও তাদের দোসরদের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। ফলে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের শেষ মুহূর্তে গত ৩ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক রহস্যজনক আদেশে নতুন লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হয়। একটি কথিত ‘তদন্তাধীন বিষয়’-এর অজুহাত দেওয়া হলেও কী সেই তদন্ত বা কেন পুরো প্রক্রিয়া থমকে গেল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।

তবে রহস্যের আসল জট খোলে একই দিনে। ৩ মার্চ নতুন লাইসেন্স স্থগিতের আদেশের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় পত্রিকায় পাঁচ বছর মেয়াদি মেগা টেন্ডার আহ্বান করে। বন্দরের সাধারণ কার্গো বার্থ নং ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮-এ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য এই দরপত্র আহ্বান করা হয়। সচেতন মহলের প্রশ্ন, নতুন লাইসেন্স প্রাপ্তি যেখানে স্থগিত, সেখানে নতুন ও আধুনিক লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই টেন্ডারে অংশ নেবে? কারণ লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। এই স্ববিরোধী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপই প্রমাণ করে, প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই প্রতিযোগীদের মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে পুরোনো সিন্ডিকেটকে একচেটিয়া বাণিজ্য উপহার দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

এই চরম বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানগুলো। গত ২৬ এপ্রিল ভার্টেক্স অব-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেড হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন। গত ১০ মে হাইকোর্ট এক রুলে জানতে চান— লাইসেন্স স্থগিতের আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং এই বিতর্কিত টেন্ডার কেন বাতিল করা হবে না। যদিও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে আদালত টেন্ডার প্রক্রিয়া সচল রাখার অনুমতি দিয়েছেন, তবে তা চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকবে বলে স্পষ্ট করে দেন। আদালতের এই হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে, প্রথম দর্শনেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ও আইনি লঙ্ঘনের উপাদান রয়েছে।

বঞ্চিতদের অভিযোগ, ফি ও নথিপত্র গ্রহণের পর কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা শুধু বৈষম্যমূলকই নয়, বরং স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। অথচ আদালতের এই রুল ও তীব্র বিতর্কের মাঝেই গত ১১ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ৩০ জুনের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। বঞ্চিতদের অভিযোগ–লাইসেন্সহীন নতুন আবেদনকারীদের ঝুলিয়ে রেখে পুরোনো লাইসেন্সধারীদের অনুকূলে টেন্ডার চূড়ান্ত করার এই চাতুর্য এখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছেও পরিষ্কার হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে ‘ভার্টেক্স অব-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (ভূ-সম্পত্তি এবং বাণিজ্য) রিপন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে কৌশলে কার্গো বার্থ ও কার্গো হ্যান্ডলিং প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখায় তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আদালত রুল জারি করেছেন। সেই রুল নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই বন্দর কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু বার্থ ও শিপিং হ্যান্ডলিংয়ের দরপত্র কার্যকর করতে যাচ্ছে। শুধু ভার্টেক্স লজিস্টিকস নয়, লাইসেন্সের জন্য এরকম আরও কয়েক শ আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে সরিয়ে দিয়ে তারা কাজটির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছে। যা সম্পূর্ণ অন্যায্য।

ফোন করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সচিব মো. নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, সম্প্রতি নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর যারা আবেদন করেছিলেন, তাদের আবেদনও বিবেচনা করা হবে। যারা যোগ্য ও সক্ষম তারা লাইসেন্স পাবে। দীর্ঘদিন লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার কারণে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন–এমন অভিযোগের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের আগ্রাসী রূপ। আধুনিক বিশ্বের বন্দরগুলোতে যখন প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে সেবার মান উন্নত করা ও খরচ কমানোর চেষ্টা চলছে, তখন চট্টগ্রাম বন্দরে ঘটছে উল্টো ঘটনা। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ক্রেন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উদ্যোক্তারা এলে কার্গো খালাসের ব্যয় কমত এবং দেশের অর্থনীতি উপকৃত হতো। কিন্তু গুটিকয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের পকেট ভারী করতে পুরো দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাকে জিম্মি করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির এই লাইফলাইনকে যদি এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা জাতীয় বাণিজ্যের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত নিয়ে আসবে। সৌজন্যে খবরের কাগজ