ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে চাহিদা বাড়ছে ই-বাইকের

Passenger Voice    |    ০২:১০ পিএম, ২০২৬-০৬-২১


ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে চাহিদা বাড়ছে ই-বাইকের

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা খুব কম খরচে দীর্ঘদিন ইলেকট্রিক যানবাহন (ইভি) চালাতে পারেন। এর বিপরীতে জ্বালানিচালিত যানবাহন সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি পেট্রল ও অকটেনের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে দেশে জ্বালানিসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করায় ই-বাইকের বিক্রি হঠাৎ বেড়ে যায়।

আগে যেখানে মাসে গড়ে ১ হাজার ই-বাইক বিক্রি হতো, মার্চে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১০০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এরপর থেকেই বিক্রি বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে মাসিক বিক্রি ৩ হাজারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশে দ্রুত বড় হওয়া বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাজারে ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড প্রবেশ করেছে।

জ্বালানিসংকটের ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতেই ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল (ই-বাইক) কিনেছি। দাম তুলনামূলক কম। যাতায়াত খরচও কম। একবার পুরো চার্জ দিতে খরচ পড়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। তাতে ১০০ কিলোমিটারের বেশি যায়। সারা দিনে মাত্র কয়েক টাকা খরচ হয়। জ্বালানির ঝামেলা নেই।’ ই-বাইক কেনার ব্যাপারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মিরপুরের মো. শাকিল এভাবে অভিমত প্রকাশ করেন।

অন্য ক্রেতারাও জানান, ই-বাইকের দাম কম। জ্বালানির ঝামেলা নেই। তবে ব্যাটারির কোয়ালিটি আরও ভালো করা দরকার। বিক্রেতারা বলছেন, দামের ব্যাপারে যত না চাহিদা, জ্বালানির ঝামেলা থেকে রক্ষা পেতেই ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে বেশি। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তার সরাসরি ধাক্কা লাগে জ্বালানিতে। জ্বালানি পেতে দুর্যোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই বাহন। বিক্রিও বাড়ছে আমদানি করা এই বাহনের। গতকাল ক্রেতা-বিক্রেতা ও আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা খুব কম খরচে দীর্ঘদিন ইলেকট্রিক যানবাহন (ইভি) চালাতে পারেন। এর বিপরীতে জ্বালানিচালিত যানবাহন সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি পেট্রল ও অকটেনের ওপর নির্ভরশীল। তাই গত ফেব্রুয়ারির শেষে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে দেশে জ্বালানিসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এই জ্বালানি সংকট শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ই-বাইকের বিক্রি হঠাৎ বেড়ে যায়।

আগে যেখানে মাসে গড়ে ১ হাজার ই-বাইক বিক্রি হতো, মার্চে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১০০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এরপর থেকেই বিক্রি বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে মাসিক বিক্রি ৩ হাজারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশে দ্রুত বড় হওয়া বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাজারে ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড প্রবেশ করেছে। বর্তমানে দেশে ১০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল আমদানি, সংযোজন ও বাজারজাত করছে। বাজারের একটি বড় অংশই রয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান রিভো ও ইয়াদিয়ার দখলে।

নিউ গ্রামীণ মটরস লিমেটেড, রানার মোটরস লিমিটেড, ওয়ালটন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত। ব্র্যান্ডভেদে এসব মোটরসাইকেলের দাম ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়ে ১৫ থেকে ২০ পয়সা। অন্যদিকে জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলে খরচ পড়ে ২ থেকে ৩ টাকা। ফলে খরচের দিক থেকে ই-বাইক অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

এ কারণে এটির প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে এখনও দেশের চার্জিং অবকাঠামো ও ব্যাটারির মান নিয়ে অনেক গ্রাহক উদ্বেগের কথা জানান।চায়না কোম্পানির ‘ইয়াদিয়া’ ব্র্যান্ডের ই-বাইক ডিলার হচ্ছে রানার গ্রুপ। তারা বর্তমানে ১২টি ‘ইয়াদিয়া’ ব্র্যান্ডের ই-বাইক বাজারজাত করছে। যেগুলোর দাম ফিচার অনুযায়ী ৮৫ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার মধ্যে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড়ে ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের একটি বিক্রয়কেন্দ্রের নির্বাহী খায়রুল আলম শান্ত খবরের কাগজকে বলেন, ‘বছর দুই হলো এই শোরুম খোলা হয়েছে। আগের তুলনায় বিক্রি বাড়ছে। বিশেষ করে গত মার্চে জ্বালানি সংকট শুরু হলে চাহিদা অনেক বাড়তে থাকে। এর ফলে তাদের বিক্রি বেড়েছে। সংখ্যাটা সঠিকভাবে বলা যাবে না। তবে এটা নিশ্চিত বলা যায় বিক্রি প্রতি মাসে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ইয়াদিয়ার ৮৬টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি মাসে বিক্রয় কেন্দ্রও বাড়ছে। ঢাকা শহরের মতো অন্য শহরেও চাহিদা বাড়ায় বিক্রি বাড়ছে।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের প্রকৌশলী হাসান আলী জানান, ‘১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে তিনি ভালো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু গত মার্চের শুরুতে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেট্রল পাম্পে অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য ও সময় ছিল না। জ্বালানি তেল নেওয়ার লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। জ্বালানি সংকটের সময় একদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছিল। বাধ্য হয়ে তিনি ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় চীনের ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের একটি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল কিনেন। বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলে প্রতি কিলোমিটার যেতে ২০ পয়সারও কম খরচ হয়। প্রতিদিনই টুকটাক কাজে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। আগে প্রতি লিটার জ্বালানিতে ৭-৮ কিলোমিটার যাওয়া যেত। এখন ই-বাইকে এক চার্জে ১০০ কিলোমিটারের বেশি যাওয়া সম্ভব।

অন্য ব্যবহারকারীরাও জানান, শহরে স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল একটি উপযোগী বাহন। ব্যাটারির সক্ষমতা অনুযায়ী এসব মোটরসাইকেল ১০০ কিলোমিটারের বেশি চলতে পারে। যেহেতু এতে শুধু মোটর ও ব্যাটারি থাকে, তাই রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম। পাশাপাশি এটি পরিবেশবান্ধব এবং জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম খরচে চলাচল করা যায়।

আগামী ২ বছরে মোট ব্যবহারের ৩০ শতাংশে পৌঁছবে  

এ ব্যাপারে রানার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ই-বাইক সাধারণ গাড়ির মতো জটিল না। এতে মূলত শুধু একটি মোটর ও একটি ব্যাটারি থাকে। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের খরচও অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে দুই চাকার বাহন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাশ্রয়ী মূল্য, সহজ ব্যবহার এবং শহর ও গ্রাম, উভয় জায়গায় চালানোর উপযোগী হওয়ায় ই-বাইক এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে ই-বাইকের ব্যবহার খুব ধীরে বাড়লেও সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের পর হঠাৎ করে চাহিদা বাড়তে থাকে। বর্তমানে মোট মোটরসাইকেলের মধ্যে ৮ থেকে ১০ শতাংশ ই-বাইকের (অংশ) আওতায় এসেছে। আগামী ২ বছরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছে যাবে। ই-বাইকের চার্জিং ব্যবস্থা, ব্যাটারির স্থায়ীত্বের ব্যাপারে এখনো অনেকের উদ্বেগ আছে। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এগুলো বড় কোনো সমস্যা না। ই-বাইক চার্জ দেওয়া অনেকটা মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার মতোই সহজ।

একবার ফুল চার্জ দিতে খরচ পড়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। এটি রাতে সহজেই করে রাখা যায়। তাতে ১০০ কিলোমিটার চলা সম্ভব। নতুন ধরনের ব্যাটারি প্রযুক্তি, বিশেষ করে সলিড-স্টেট ব্যাটারি এসে গেলে ই-বাইকের ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়বে। তাই স্পষ্টভাবেই বলা যায় ই-বাইক একটি ভালো ও সুবিধাজনক সমাধান। কারণ ই-বাইকের গতি কম। ব্রেকিং সিস্টেমও ভালো। সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও কম।’

রানার গ্রুপের মতো দেশের বড় ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনও ‘টাকিয়ন’ ব্র্যান্ডের সাতটি মডেলের ই-বাইক বাজারে বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মার্চে পাম্পগুলোতে জ্বালানির সংকট তীব্র হলে ই-বাইকের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কারণ জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় ই-বাইকে কোনো ঝামেলা নেই। একবার পুরো চার্জে মডেলভেদে ৮০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলা যায়।

দেশে ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশে চীনের রিভো ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র আছে ৬০টি। গত মার্চ ও এপ্রিলে জ্বালানিসংকটে বিক্রি বাড়ায় বড় ভূমিকা রেখেছে। দেশে ‘টাকিয়ন’ নামে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল তৈরি করে ওয়ালটন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। তারা বর্তমানে ৭টি মডেলের ই-বাইক তৈরি করছে, যেগুলোর দাম ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রও জানায়, সম্প্রতি ই-বাইকের আমদানি বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৭ হাজার ৬৫৮টি ই-বাইক আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানি বেড়ে ১২ হাজার ৩৩০টিতে দাঁড়ায়। এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৬১ শতাংশের বেশি। এ বছর আরও বাড়ছে। কারণ গত ফেব্রুয়ারির শেষে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি সংকটে অনেকেই ঝামেলা এড়াতে ই-বাইকের দিকে  ঝোঁকেন। নতুন বাজেটেও ইলেকট্রিক গাড়িতে (ইভি) ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবহার আরও বাড়বে।