দুই দিনে ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

Passenger Voice    |    ১১:০৩ এএম, ২০২৬-০৬-১৬


দুই দিনে ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আমানতকারীদের চাপ সামলাতে গতকাল সোমবারও বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে বিশেষ ধার হিসেবে আরও ২ হাজার ৫ কোটি টাকা দিয়েছে। এর এক দিন আগে গত রবিবারও বাংলাদেশ ব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে।

অর্থাৎ গত দুই দিনে বিশেষ তারল্য সহায়তা হিসেবে মোট ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকালও ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের টাকা তোলার হিড়িক দেখা গেছে। যদিও টাকা উত্তোলনের চাপ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব নিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন। দায়িত্ব নিয়ে গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখন পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। আমানতকারীদের নির্বিঘ্নে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার অনুরোধ করেন। তিনি জানান, যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে যাচাই-বাছাই চলছে। ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ ব্রিফিংয়ের সময় ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইসলামী ব্যাংকে পর্ষদ গঠন বিষয়ে মোহাম্মদ জহির হোসেন জানান, পাঁচ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ লোক দিতে চাই, যারা এই ব্যাংকটিকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন। আশা করি, খুব শিগগির আপনারা একটি সুন্দর ও নিরপেক্ষ বোর্ড পাবেন। তিনি সীমিত সময়ের জন্য এক সদস্য বোর্ডের দায়িত্ব পালন করছেন, যাতে ব্যাংকের কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে। সাবেক এমডি ওমর ফারুককে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহির হোসেন জানান যে, তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং পরিচালনা পর্ষদ তা গ্রহণ করেছে। ফলে তাকে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই।’

এ সময় ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হুসাইন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা হিসেবে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছে ব্যাংকটি। তিনি বলেন, গতকালও আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছি। সেই অর্থের পুরোটা এখনো ব্যবহার করতে হয়নি। আশা করি, যারা আতঙ্কে টাকা তুলে নিয়েছেন, তারা আবারও ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখে ফিরে আসবেন।’ 

আলতাফ হুসাইন আরও জানান, দেশের একটি বড় শাখা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, আগের তুলনায় হিসাব বন্ধের পরিমাণ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে, যা গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। 

ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ ব্যাংক এমডিদের
আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও চেয়ারম্যানকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকটির কার্যক্রম নতুনভাবে শুরুর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)।

গতকাল এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের পক্ষ থেকে পাঠানো এ-সংক্রান্ত বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, এ সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতের জন্য সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসলামী ব্যাংক ইস্যুটি রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করেছিল এবং ব্যাংকটির প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব বিবেচনায় এবিবি ১০ জুন গভর্নরের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। আমরা জানিয়েছিলাম, দ্রুত সমাধান ব্যাংকিং খাতের জন্য উপকারী হবে, কারণ ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি আর একটি একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ছিল না; এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়ছিল। বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছিলাম। এ প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক গতকাল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি, এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।’

আন্দোলনকারীদের দাবি: ২০১৭ সালের আগের মালিকদের কাছে ইসলামী ব্যাংক ফিরিয়ে দিতে হবে

২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের সময় যেসব শেয়ার আগের মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল, তা প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। এ দাবি জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম ব্যানারে আন্দোলনকারী গ্রাহকরা। এই দাবিসহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা, মালিকানা ও গ্রাহকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবি নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেবে সংগঠনটি। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম নেতারা এই কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এই সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচির কথা জানান সংগঠনের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও জোন পরিচালক অধ্যাপক নুর উন নবী।

সংগঠনটির দাবি, দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছিলেন এই গ্রাহক ফোরামের আন্দোলনকারীরা। কিন্তু গত রবিবার চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলসহ পুরো পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পরও তারা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল তারা নতুনভাবে দাবি জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের সময় যেসব শেয়ার আগের মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল, তা প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।