শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১৮ এএম, ২০২৬-০৬-১১
অবশেষে কোনো প্রশ্ন করা ছাড়াই সুনির্দিষ্ট খাতে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দিতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে আবাসন খাতে জমি, বিল্ডিং বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের চেয়ে প্রকৃত মূল্য বেশি হলে স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘোষণা দিলে অপ্রদর্শিত অতিরিক্ত অর্থ নিয়মিত কর দিয়ে বৈধ করা যাবে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা থাকবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমন সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এ জন্য অর্থবিলে আলাদা একটি ধারা সংযুক্ত হতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ধারাটি যুক্ত করার প্রস্তাব পাস হলে কোনো করদাতার জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার প্রকৃত মূল্য দলিল মূল্যের চেয়ে বেশি হলে তিনি ওই অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর ব্যক্তি শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য নিয়মিত করহারে আয়কর পরিশোধ করতে পারবেন। অর্থ আইন বা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই কর পরিশোধ করলে সে বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।
জানা গেছে, যদি অর্থ আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তির এ ধরনের বিষয়ে কোনো কার্যক্রম ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়ে থাকে তাহলে অতিরিক্ত ক্রয় বা বিক্রয়মূল্যের ওপর প্রযোজ্য করের সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য আদালতে আগে থেকেই দোষী প্রমাণিত হওয়া কোনো ব্যক্তি এই ধরনের সুবিধা পাবেন না।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ দিলে টাকা পাচার কমে আসবে। অচল মূলধন অর্থনীতির মূলধারায় ফিরবে। ফলে স্থবিরতা কাটবে বেসরকারি বিনিয়োগে।
এ বিষয়ে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, রিহ্যাবের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সময়োপযোগী। অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে যে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত বা অলস অর্থ জমে আছে, সেগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা জরুরি। আবাসন শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে বিনিয়োগ দ্রুত অর্থনৈতিক চক্রে ফিরে এসে নির্মাণ শিল্প, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহনসহ অসংখ্য লিংকেজ শিল্পকে সক্রিয় করে তোলে।
তিনি বলেন, সরকার যদি স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়, তাহলে তা একদিকে যেমন রিয়েল এস্টেট বাজার গতিশীল হবে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে আবাসন সংকট মোকাবিলা, নগর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলে মনে করেন আলী আফজাল। তাঁর মতে, দীর্ঘ মেয়াদে এমন করব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে করহার যৌক্তিক হবে, কর প্রদান সহজ হবে এবং মানুষ স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। করের বোঝা অতিরিক্ত হলে মানুষ কর ফাঁকির পথ খোঁজে, কিন্তু করহার যৌক্তিক হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়ে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতাও কমে।
তবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়াকে অসাংবিধানিক, দুর্নীতি সহায়ক ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এমন সুযোগ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতিকে আইনগত সুরক্ষা দেওয়া ও বিচারহীনতার শামিল। তিনি বলেন, আবাসন খাতে ব্যবসায় স্থবিরতা দূর, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অজুহাতে এ জাতীয় দুর্নীতি সহায়ক সুযোগ দেওয়া সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এমন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করার সমান মন্তব্য তিনি এই সুযোগ চিরতরে বন্ধ করার আহ্বান জানান।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, যদি এই সুযোগ দিতেই হয়, তবে দুর্নীতি বা অন্যায়ের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থকে কোনোভাবেই সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু যারা নানা কারণে রিটার্নে তার অর্থ দেখাতে পারেননি, তাদের এই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, বৈধ পথে উপার্জিত কিন্তু কর ফাঁকি দেওয়া অর্থকে নিয়মিত করের চেয়ে কিছুটা বেশি হারে কর ও জরিমানা দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, আবাসন বা স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে কালো টাকা রোধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মৌজা রেট বা সরকারি নির্ধারিত মূল্যকে বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা। এর জন্য বাজারভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা তৈরি করে সময় সময় তা হালনাগাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত