৭ দিনে ৪ হাজার কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে ইসলামী ব্যাংক

Passenger Voice    |    ০২:০৭ পিএম, ২০২৬-০৬-০৯


৭ দিনে ৪ হাজার কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে ইসলামী ব্যাংক

গ্রাহকদের বিক্ষোভের কারণে বেড়ে গেছে ইসলামী ব্যাংকের আমানত উত্তোলন। ফলে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির চাপ বাড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কর্মকর্তাদের চাপের মুখে পদত্যাগ করা ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রতিবাদে ১ জুন শুরু হয় বিক্ষোভ। এরপর মাত্র ৭ দিনে ব্যাংকটি ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে।

অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। ৭ জুন সেখান থেকে কমে ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটিতে নেমে এসেছে।

‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে চলা কর্মসূচির কারণে কয়েকটি শাখার কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ব্যাংকটি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য আমানত উত্তোলনের চাপের মুখে রয়েছে। ‘চলমান অস্থিরতার কারণে অনেক গ্রাহক তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন।’

তিনি জানান, নেতিবাচক প্রচারণা, শাখাগুলোতে গ্রাহকদের বিক্ষোভ এবং মৌসুমি কারণে আমানত কমছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও তাদের পরিচালন ব্যয় মেটাতে অর্থ তুলে নিচ্ছে।

‘বর্তমান অস্থিরতা কেটে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে,’ মনে করেন তিনি।

আলতাফের মতে, সম্প্রতি শেয়ারবাজারে ব্যাংকটির ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমনও আমানত কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

খুরশীদ আলমকে নিয়োগের ঘোষণা আসার পর ঈদের ছুটি শেষে প্রথম কর্মদিবস ১ জুন শত শত মানুষ মতিঝিলে জড়ো হয়ে তার নিয়োগ বাতিল এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবি জানান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করা বাংলাদেশ ব্যাংকে চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার একজন ছিলেন খুরশীদ।

এক বিবৃতিতে সচেতন গ্রাহক ফোরাম জানায়, তাদের সাতটি দফা দাবির সমর্থনে গতকাল কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের ‘অবৈধ চেয়ারম্যানের’ পদত্যাগ, আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কথিত ব্যাংক লুটেরাদের অপসারণ।

‘জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা’
ফোরামটি গ্রাহকদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দিলেও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই প্ল্যাটফর্মকে সমর্থন দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ব্যাংকের কয়েকজন কর্মচারীকেও দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল বলে মনে করা হয়।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ১ জুন দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ব্যাংক রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর পুলিশ হামলা চালিয়েছে। তিনি পুলিশের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান এবং আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি দলের সমর্থন ঘোষণা করেন।

দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য রেজাউল করিম ৫ জুন ফেসবুকে লেখেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুক্ত হবেন।

ওই পোস্টে উল্লেখ করা হয়, সরকার যদি গ্রাহকদের দাবি মেনে না নেয় এবং ‘আওয়ামী লীগ সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখে, তাহলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের মতো রেমিট্যান্স বন্ধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিতে পারেন।

দেশ-বিদেশের গ্রাহকদের সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, ব্যাংকের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৮৩ সালে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জামায়াত ও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় বারবার পরিবর্তন এসেছে।

জামায়াত ও গ্রাহক ফোরামের কথিত সম্পর্ক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আলতাফ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তিনি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ১ জুন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, কোনো ব্যাংকের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম জড়িয়ে পড়া উচিত না। ‘রাজনৈতিক পরিচয় একটি ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করে।’

কোনো ব্যাংক যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে এগোতে চায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির টেকসই অবস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, যোগ করেন তিনি।

খেলাপি ঋণ
বর্তমানে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংকে। যার পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

এস আলম গ্রুপ ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণ নিজেদের ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে সরিয়ে নেয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাধীন পরিচালকদের একটি পর্ষদের অধীনে ইসলামী ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে।

আলতাফ বলেন, ‘খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সেখান থেকে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি খুবই সীমিত।’

তিনি আরও বলেন, অন্যান্য ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকেও ঋণ আদায়ের চেষ্টা চলছে। তবে নিয়মিত গ্রাহকদের অনেকে এখন ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহী হয়ে পড়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। সৌজন্যে দ্যা ডেইলি স্টার বাংলা