শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১২ এএম, ২০২৬-০৬-০৯
দেশে ঈদ, বিশ্ব ইজতেমা, ভর্তি পরীক্ষা, অন্যান্য উৎসব কিংবা বড় রাজনৈতিক সমাবেশকে ঘিরে ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বাংলাদেশে বহুদিনের বাস্তবতা। যাত্রীদের একটি অংশ ট্রেনের ছাদে চড়েও ভ্রমণ করেন। এতে যেমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি রেলওয়ের রোলিং স্টকের (ট্রেনের ইঞ্জিন-কোচ) ওপরও ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত ঈদযাত্রায় রেলপথে অন্তত ৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন। আর এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভ্রমণের কারণে ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, ছাদে ভ্রমণের কারণে ট্রেনের যান্ত্রিক ক্ষতি হচ্ছে, যার কারণে বাড়ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ব্যাহত হচ্ছে সেবার মান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ইনফরমেশন বুক’ অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহনের জন্য মোট ২ হাজার ৬৪২টি কোচ রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫২টি ব্রড গেজ এবং ১ হাজার ৪৯০টি মিটার গেজ লাইনের জন্য। তবে সব কোচ সচল নয়। ব্রড গেজ লাইনের মোট ৫৬১টি যাত্রীবাহী বগির মধ্যে ১৬২টি বর্তমানে অকেজো বা মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে সচল রয়েছে ৩৯৯টি বগি, যা মোট বগির ৭১ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে মিটার গেজ লাইনের মোট ১ হাজার ২৪৩টি বগির মধ্যে ২৪২টি অকেজো থাকলেও ১ হাজার ১টি বগি ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রাপ্যতার হার ৮০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিতসংখ্যক সচল বগি দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে হয়। ঈদের মতো উৎসবের সময় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। তখন অনেক ট্রেনে ধারণক্ষমতার দুই-তিন গুণ বেশি যাত্রী ওঠেন। শুধু বগির ভেতর নয়, ছাদেও অবস্থান নেয় শত শত মানুষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, ‘রেলওয়ের বগিগুলো নির্দিষ্ট ওজন বহনের জন্য নকশা করা হয়েছে। কিন্তু ঈদের সময় যখন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ওঠেন, তখন ট্রেনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালাতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত চাপের ফলে বগির স্প্রিংগুলো পুরোপুরি বসে যায় এবং বিভিন্ন সেফটি আইটেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈদের পর প্রতিটি বগি নতুন করে পরীক্ষা করতে হয়। এতে ট্রেনের আয়ু সরাসরি কমে না গেলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে যে মেরামত দুই মাস পর করার কথা, সেটি ১৫ দিনের মধ্যেই করতে হয়। ফলে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ সূচি ব্যাহত হয়।’
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, পরিবহন, বাণিজ্যিক ও আইন-শৃঙ্খলা বিভাগ যৌথভাবে কাজ করলেও উৎসবমুখর সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ট্রেনের নিরাপত্তা, সময়ানুবর্তিতা এবং যান্ত্রিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শুধু বেআইনি নয়, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও। ট্রেন কোনো বাঁক বা মোড় অতিক্রম করার সময় কেন্দ্রবিমুখী বলের কারণে ছাদে থাকা যাত্রীরা ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে পারেন। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘অতিরিক্ত যাত্রীর ওজনের কারণে বিশেষ করে মিটার গেজ ট্রেনের সাসপেনশন স্প্রিংগুলো পুরোপুরি বসে যায়। তখন বগির বডি বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঙ্গে ঘর্ষণে জড়িয়ে পড়ে। এতে যান্ত্রিক ক্ষতি হয় এবং অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ভেঙেও যায়। ফলে সংশ্লিষ্ট বগিগুলো দ্রুত ওয়ার্কশপে পাঠাতে হয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী কোচ ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোও জরুরি। অন্যথায় প্রতি উৎসব মৌসুমেই একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে, অন্যদিকে রেলওয়ের মূল্যবান রোলিং স্টকের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে সেবার মান আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রেলওয়ের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো যাত্রী চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়ে এ ব্যবধান আরো প্রকট হয়ে ওঠে। ঢাকায় কর্মসংস্থান ও জীবিকার কারণে উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করে। ঈদের ছুটিতে এদের বড় অংশ একসঙ্গে বাড়ি ফেরায় এ রুটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তাই এ রুটে অতিরিক্ত ট্রেন, কোচ ও লোকোমোটিভ সংযোজনের মাধ্যমে পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।’
দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রেলওয়ের নিজস্ব কোচ ও লোকোমোটিভ বহর সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত আগামী বাজেটে রেল পরিচালনা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এসব সরঞ্জাম সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেয়া। তবে নতুন কোচ ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং বহর সম্প্রসারণে সময় লাগবে। তাই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে উৎসব মৌসুমে প্রতিবেশী দেশ থেকে ব্রড গেজ কোচ বা লোকোমোটিভ ভাড়া বা লিজ নেয়ার উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দেয়া সহজ হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণও কমানো সম্ভব হবে।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত