শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৩৪ এএম, ২০২৬-০৬-০৩
নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম ও পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের অপসারণসহ সাত দফা দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের একাংশ। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, তারা মোবাইল ফোনে মেসেজ পেয়ে আন্দোলনে যোগদান করেছেন। প্রধান কার্যালয়ের সামনেসহ সারা দেশেই তারা এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
যদিও ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারীদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা প্রকৃত আমানতকারী কি না, সেই বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। তারা বিভিন্ন নামে-বেনামে ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। রাস্তার কোনো আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না। মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
এদিকে গতকাল সকাল ৯টার দিকে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাহক। যদিও ইসলামী ব্যাংকের মোট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। এ সময় তাদের হাতে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনে অনিয়ম হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলেও ঘোষণা দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। এদিনও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য, জলকামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে। যদিও দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
বিক্ষোভ কর্মসূচির পর সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন সচেতন গ্রাহক ফোরামের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে দাবিগুলো তুলে ধরেন ফোরামের আহ্বায়ক ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও জোন পরিচালক নুর নবী মানিক।
এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর পল্টন থানার আমির মো. শাহীন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি মনজুর ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক শাহীন আহমেদ খান, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় মো. হাসান, জামায়াতে ইসলামীর কোতোয়ালি থানার আমির মতিউর রহমান, ওয়ারী থানার নেতাসহ দলটির অন্য নেতা-কর্মীরা।
আন্দোলনকারীদের অনেকেই জানেন না নিজ শাখার নাম, মেসেজ পেয়েই তারা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে গতকালও সকাল ৯টা থেকে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শাখা থেকে আসা গ্রাহকরা। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় দেননি। তবে মেসেজ পেয়েই মতিঝিলে আন্দোলনে আসেন বলে তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য অধ্যাপক নুর নবী মানিক হচ্ছেন এই ফোরামের আহ্বায়ক। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ চেয়ে ব্যানার হাতে নিয়ে সড়কে আন্দোলন শুরু হয়। তবে অনেক বিক্ষোভকারীই ঠিকমতো বলতে পারেননি যে তারা কোন শাখার গ্রাহক।
প্রচণ্ড রোদের মধ্যেও বিভিন্ন বয়সের গ্রাহকরা সড়কে ব্যানার হাতে নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। এ সময় ইসলামী ব্যাংকের সামনে হাতে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় মো. সাবিত আলীকে। তিনি কোন শাখার গ্রাহক জানতে চাইলে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করতে থাকেন। পরে জানান পল্লবী শাখার গ্রাহক।
ব্যাংকের পরিচালনায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তারা মাঠ ছাড়বেন না বলে জানান। মেসেজ পেয়েই তারা মতিঝিলে এসেছেন বলেও জানান তিনি।
অধ্যাপক নুর নবী মানিক এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ‘আমরা তার সঙ্গে আছি। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
গভর্নরের পদত্যাগসংবলিত ব্যানার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় হাসান তারেককে। তিনিও বলেন, ‘আমি বনশ্রী ও মিরপুর শাখার গ্রাহক। মেসেজ দেওয়া হয়েছে। তা পেয়েই এখানে সকালে এসেছি। প্রচণ্ড রোদে অনেক কষ্ট হচ্ছে। ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে বারবার পরিবর্তনে আমরা সাধারণ গ্রাহকরা চরম উদ্বেগের মধ্যে আছি। ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। তাই আমানত রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছি।’
শফিকুল আলম নামে আরেকজন গ্রাহক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের আহ্বায়ক মেসেজ দিয়েছেন। আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবে।’ শুধু এই কয়জনই নন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অন্যরাও ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য দেন।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই: বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম শক্তিশালী একটি ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই ইসলামী ব্যাংকের পাশে আছে।
তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের পাশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকবে। তাদের অবস্থান আরও মজবুত হবে।’
তাই ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক, আমানতকারী, রেমিট্যান্স প্রেরক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। গত সোমবার ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ভার্চুয়াল বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদত্যাগপত্র গ্রহণ এবং স্থায়ী এমডি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত এমডি দায়িত্ব পালন করে যাবেন–এই সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।
মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ধরনের আন্দোলন বা চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে না। জনস্বার্থ ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো পক্ষের আন্দোলনের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাতিল করার সংস্কৃতি বাংলাদেশ ব্যাংক সমর্থন করে না।
আরিফ হোসেন বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রথম সারির ইসলামী ধারার ব্যাংক। বিভিন্ন সময়ে নানা সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়েও ব্যাংকটি টিকে আছে এবং শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাময়িক কিছু ঘটনা ব্যাংকের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মৌলিক শক্তি অটুট রয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংকের গ্রাহক বা আমানতকারী ব্যাংকের মালিকানা নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি করতে পারেন না।
এটি আবেগের বিষয় হতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমানতকারীদের যৌক্তিক দাবি হওয়া উচিত, ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যক্তিরা থাকবেন, যাদের কাছে গ্রাহকদের আমানত নিরাপদ থাকবে।
নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে নিয়ে ওঠা বিতর্ক প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে আর্থিক বা নৈতিক অনিয়মের প্রমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নেই। অতীতে যে অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তদন্তে সেসব অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি। সে কারণে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তও সংশোধন করা হয়েছে। খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেনি বলেও দাবি করেন মুখপাত্র।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকারী এই কর্মকর্তা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়ন ইতিবাচক। ভার্চুয়াল বোর্ড সভার বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র বলেন, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সভাটি আয়োজনের অনুমতি দিয়েছিল। চেয়ারম্যানের ব্যাংকে প্রবেশে বাধা দেওয়ার আশঙ্কা ও সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের গর্ব করার মতো প্রতিষ্ঠান। অতীতেও নানা ঝড়-ঝাপটা মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠানটি টিকে ছিল; বর্তমানে ব্যাংকটির তারল্য বা কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পাশে আছে। গ্রাহকরা যেভাবে অতীতে আস্থা রেখেছেন, ভবিষ্যতেও সেই আস্থা বজায় রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন আরিফ হোসেন।
স্ত্রীর ঋণখেলাপির কারণে খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হওয়ায় বাধা নেই: বাংলাদেশ ব্যাংক
ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম ঋণখেলাপি কি না, এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খুরশীদ আলম নিজে ঋণখেলাপি নন, তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি। স্ত্রীর ঋণখেলাপির কারণে খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে তিন কোটি টাকা ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিক খুরশীদ আলমের স্ত্রী। ওই ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ফলে খুরশীদ আলমকে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা সঠিক নয়। তার স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি হলেও খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন। স্ত্রীর ঋণখেলাপির কারণে খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।’ সৌজন্যে ঢাকা পোস্ট
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত