ঈদ আনন্দ শেষে সকলে আজ ফিরছে কর্মস্থলে

সড়ক দুর্ঘটনার হার না কমলেও ঈদযাত্রায় ছিল বিআরটিএর কঠোর মনিটরিং

Passenger Voice    |    ০১:৫১ এএম, ২০২৬-০৬-০১


সড়ক দুর্ঘটনার হার না কমলেও ঈদযাত্রায় ছিল বিআরটিএর কঠোর মনিটরিং

জান্নাতুল মায়াঃ সারাদেশে থেমে থেমে বৃষ্টি, পথে-ঘাটে জলাবদ্ধতা, পরিবহন সংকট, বাড়তি ভাড়া, দুর্ঘটনার ঝুঁকি  সবকিছু উপেক্ষা করে প্রতিবারের মতো এবারও পরিবারের সাথে ঈদুল আযহার ছুটি কাটাতে বাড়ি গিয়েছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদশেষে কর্মস্থলে ফিরছে অনেকে, আজ ১লা জুন ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগ দিবেন শ্রম-কর্মজীবিরা। এবারের ঈদযাত্রায় নৈরাজ্য ঠেকাতে কঠোর মনিটরিং করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ। সংস্থাটির সৃষ্টির পর থেকে এবারে প্রথম ঈদযাত্রায় ব্যাপক কর্মতৎপরতা দেখা যায়। তবে নিয়ন্ত্রণ হয়নি সড়কে লাশের মিছিল। 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।  গত ২১ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬১ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২৪ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তিনদিনে সড়কে ঝড়েছে ৭২ জনের লাশ। ঈদের আগের দিন অর্থাৎ গত বুধবার সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। 

তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সরকার গঠন করেলে সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহন করেন শেখ রবিউল আলম। আর গত ৬ মে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর চেয়ারম্যান পদে যোগদান করেন মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান। একটি নবাগত সরকার ও একজন নতুন চেয়ারম্যান সল্প সময়ের মধ্যে ঈদযাত্রায় নৈরাজ্য ঠেকাতে ব্যাপক কর্মতৎপরতা সৃষ্টি করেছে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন কঠোর মনিটরিং অন্য কোন ঈদযাত্রায় দেখা যায়নি। 

ঈদুল আযহা-২০২৬ উপলক্ষে সড়কপথে যানবাহন চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে গত ২১ মে স্মারক নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০২.৪৯.০০০৭.২৫(অংশ-২)-১৯৮ সংখ্যক স্মারকের আদেশে ৫৫ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে গত ২২ মে থেকে আগামী ০৬ জুন পর্যন্ত সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেন বিআরটিএ। পরবর্তীতে ২৪ মে নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-১১৪১ সংখ্যক আরেক আদেশে আরো ৬ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে  দায়িত্ব প্রদান করা হয়। উক্ত দায়িত্ব পালনে এবারের ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরতে পারেনি বিআরটিএর কোন কর্মকর্তা-কর্মচারি। 

সংস্থাটি এবারের ঈদযাত্রা মনিটরিং এর জন্য কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে। এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে লাগানো হয়েছিল সিসিটিভি সংযোগ। গত ২০ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত বিআরটিএর সার্বিক কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় সাধনের জন্য ফোকাল পারসন হিসেবে সংস্থার পরিচালক (প্রশাসন) নাজনীন হোসেন, সহকারী ফোকাল পারসন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শহীদুল্লাহ, সহকারী ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন উপপরিচালক (প্রশাসন) সামিউল মাসুদ। ৩১ মে তারিখের আরেক আদেশে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কার্যক্রম আগামী ০৬ জুন পর্যন্ত সম্পসারিত করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান। 

সূত্র বলছে, মহাখালী বাস টার্মিনাল, কাকলী, বনানী, ইসিবি চত্বর এলাকায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব প্রীতম সাহা। গত ২২ মে থেকে এই এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ১০ টি অভিযান পরিচালনা করে ০৫ টি মামলায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করেন। এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন তিনি। বেশ কিছু বাসের অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রী ফেরত প্রদানে বাধ্য করা হয়েছিল। 

তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর বিষয় কঠোর ভাবে মনিটরিং করেছে বিআরটিএর গাজীপুর সার্কেল। জেলা প্রশাসনের ৫ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে ৫৫ টি মামলায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়ক নিরাপত্তা আসলে কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি একটি সংস্কৃতি এবং সারা বছরের চর্চার বিষয় । ‘আমাদের দেশে প্রতি বছর ঈদের আগে কাগজে-কলমে নানা হুঁশিয়ারি দেয়া হয় আনফিট গাড়ি চলবে না, অবৈধ হাটবাজার বসবে না কিংবা দক্ষ চালক ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো বছরের স্বাভাবিক সময়ে যে নিয়ম আমরা কেউ মেনে চলি না, ঈদের মতো একটা অস্বাভাবিক সময়ে রাতারাতি তা কার্যকর করা অসম্ভব। শুধু ঈদের আগে প্রশাসনের হুঁশিয়ারি দিয়ে সড়ক নিরাপদ করা যাবে না, এর জন্য প্রয়োজন ৩৬৫ দিনের নিরবিচ্ছিন্ন অভ্যাস। যদি সারা বছর ধরে নিয়ম মেনে রুট পারমিট ও ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হতো, চালকদের কর্মঘণ্টা বেঁধে দেয়া হতো, তবে ঈদের সময়ে এসে প্রশাসনকে এত হিমশিম খেতে হতো না।’

‘পৃথিবীর যেকোনো দেশে উৎসবের সময় সড়কের সক্ষমতার চেয়ে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। চাপ বাড়লে কিছুটা যানজট বা দুর্ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদের সময় যেভাবে লাশের মিছিল নামে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সারা বছর ধরে যদি আমরা সড়কের নিয়ম ও বিজ্ঞানসম্মত ট্রাফিক ব্যবস্থা মেনে চলার প্র্যাকটিস করি, তবে ঈদের মতো উপচে পড়া চাপের সময়েও দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা একটা নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যে রাখা অবশ্যই সম্ভব।’

বিআরটিএর ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিঃ) শফিকুজ্জামান ভুঁইয়া প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন,  ঢাকা মহানগরীর চারটি বাস টার্মিনাল এবং দেশের প্রতিটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালে বিআরটিএ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ভিজিল্যান্স টিম ও মোবাইল কোর্ট দায়িত্ব পালন করছে। এসব টিম যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ, যাত্রীসেবা নিশ্চিতকরণ এবং সড়ক নিরাপত্তা বিধি মানার বিষয়ে কাজ করছে। অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএর বিভিন্ন সার্কেল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও টার্মিনাল এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছে। পাশাপাশি বাস ছাড়ার আগে চালকদের অতিরিক্ত গতি পরিহার, সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে ব্রিফিং করেছে তারা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সারাদেশে দুর্ঘটনা মনিটরিং করার মতো বিআরটিএর কোন লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। দেশের অধিকাংশ জেলায় তাদের নিজস্ব কোন অফিস নেই। সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার মতো কোন যানবাহনও নেই সংস্থাটির। ফলে দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন না করে অনেকাংশে আনুমানিক ধারনা থেকে রিপোর্ট তৈরি করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক কারণ ও হতাহতের তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে পারেন না তারা। 

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। তারপরও কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে ঘরমুখী ও ফিরতি দুই যাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি শেষ হলেই মূলত এবারের যাতায়াতের প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যাবে।’ ‘গতবারের চেয়ে এবার আমাদের প্রস্তুতি আরো জোরদার করা হয়েছে। মহাসড়ক, জেলা প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি এবার বিআরটিএতেও আমরা কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছি। এছাড়া সারা দেশে গতবার যেখানে ২০-৩০টির মতো মনিটরিং স্পট ছিল, এবার তা বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করেছি। আমাদের যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে, তার পুরোটা উজাড় করে দিয়ে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’