মোটরের জোরে নয়, দামের ভারে বাড়বে গাড়ির কর!

Passenger Voice    |    ১০:৪২ এএম, ২০২৬-০৫-২৪


মোটরের জোরে নয়, দামের ভারে বাড়বে গাড়ির কর!

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বা বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে মোটরের ক্ষমতা বা কিলোওয়াটভিত্তিক শুল্ক-কর ব্যবস্থার পরিবর্তে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্তরভিত্তিক নতুন কর কাঠামো চালুর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইলেকট্রিক গাড়ির মোটরের সক্ষমতা নয়, বরং আমদানি মূল্য বা গাড়ির দামের ভিত্তিতে শুল্ক-কর নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে দাম অনুসারে ইভি বা ইলেকট্রিক গাড়িকে অন্তত তিনটি মূল্যস্তরে ভাগ করা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে সর্বনিম্ন ৯০-১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০০-২৫০ শতাংশ পর্যন্ত মোট শুল্ক-কর নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ইভি আমদানিতে মোটরের ক্ষমতা অনুযায়ী শুল্ক-কর নির্ধারণ করা হয়। এতে কম ক্ষমতার ইভিতে তুলনামূলক কম কর এবং উচ্চক্ষমতার গাড়িতে বেশি কর আরোপ করা হয়। ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত মোটর ক্ষমতার গাড়িতে মোট করভার প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি হলেও উচ্চক্ষমতার (২০০ কিলোওয়াট) বিলাসবহুল ইভিতে করভার ১২৫-১২৮ শতাংশ প্রযোজ্য।

এ বিষয়ে এনবিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান মোটর ক্ষমতাভিত্তিক কর কাঠামোতে একই ক্যাটাগরির আওতায় কয়েক গুণ বেশি দামের বিলাসবহুল ইভিও তুলনামূলক কম কর সুবিধা পাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কর ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। কারণ, ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে শুধু কিলোওয়াট দিয়ে প্রকৃত বাজারমূল্য বোঝা যায় না। আধুনিক ইভির বড় অংশের দাম নির্ভর করে ব্যাটারি, সফটওয়্যার, প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ড ভ্যালুর ওপর। কিন্তু মূল্যস্তরভিত্তিক কর কাঠামো হলে আন্ডার-ইনভয়েসিং ও কর ফাঁকির সুযোগ অনেকটাই কমবে।

তারা বলেন, একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব যানবাহনকে উৎসাহ দিতে হবে, তেমনই সেই সুযোগ ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি কম দামে বাজারে আসার সুযোগও কমাতে হবে। নতুন কাঠামোতে কম দামের সাধারণ ইভি সুরক্ষা পাবে, কিন্তু উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম গাড়িতে বেশি শুল্ক-কর গুনতে হবে। এতে রাজস্ব বাড়বে এবং কর কাঠামো আরও বাস্তবসম্মত হবে।

কেন মূল্যস্তরভিত্তিক কর কাঠামো

বর্তমান ব্যবস্থায় বাংলাদেশে ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের শুল্ক-কর মূলত মোটরের ক্ষমতা বা কিলোওয়াটভিত্তিক। কিন্তু বাস্তবে এনবিআর যাচাই করে দেখেছে, একই মোটর ক্ষমতার আওতায় দামের বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অনেক গাড়ি প্রায় কাছাকাছি কর সুবিধা পাচ্ছে। ফলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, চীনের তৈরি ১০০ কিলোওয়াটের একটি সাধারণ ইভি এবং ইউরোপীয় বা আমেরিকান ব্র্যান্ডের একটি প্রিমিয়াম গাড়ি— বিদ্যমান নিয়মে উভয়ের শুল্ক-কর একই হয়ে থাকে। অথচ দুটির বাজারমূল্যের পার্থক্য কয়েক গুণ। কর কাঠামো মোটরের ক্ষমতাভিত্তিক হওয়ায় উচ্চমূল্যের গাড়িও তুলনামূলক কম কর দিয়ে আমদানির সুযোগ পাচ্ছে।

এছাড়া, রয়েছে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের ঝুঁকি। বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানিকারকেরা অনেক সময় গাড়ির প্রকৃত মূল্য কম দেখানো, অতিরিক্ত ফিচার আলাদা দেখানো এবং ব্যাটারি বা সফটওয়্যার ভ্যালু কম দেখানো— ইত্যাদি কারণে কার্যকর করভার কমানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এসব কারণে একই কিলোওয়াট মোটর হলেও দামে বিশাল পার্থক্য থাকে। ফলে শুধু মোটর ক্ষমতা দিয়ে বিলাসবহুল ও সাধারণ গাড়ি বোঝা কঠিন। এসব কারণে সরকার আগামী বাজেটে ‘ভ্যালু বেইজড’ কর ব্যবস্থা বা মূল্যস্তরভিত্তিক মডেলে যেতে চাচ্ছে। ফলে উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়িতে বেশি কর বসানো সহজ হবে, কর ফাঁকির সুযোগ কমবে এবং সরকার বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে।

বর্তমানে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি বড় আকার ধারণ করেছে। এনবিআর উচ্চমূল্য বা বিলাসবহুল আমদানিপণ্যে কর বাড়িয়ে দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর পথ খুঁজছে। ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যে টেসলা, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজসহ প্রিমিয়াম ইভির চাহিদাও বাড়ছে। ফলে সরকার এই খাতকে নতুন রাজস্ব উৎস হিসেবেও দেখছে।

অন্যদিকে, সরকার পরিবেশবান্ধব যানবাহনে উৎসাহ দিতে চায়, পাশাপাশি বিলাসবহুল আমদানিতে রাজস্বও বাড়াতে চায়। এসব বিবেচনায় কম দামের ছোট ইভিতে তুলনামূলক কম কর এবং উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম ইভিতে ২০০-২৫০ শতাংশ পর্যন্ত করভার দিয়ে রাজস্ব আদায় করতে চায়। যদি নতুন এমন কাঠামো কার্যকর হয়, তাহলে ছোট ও মাঝারি ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল বাজার খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নাও হতে পারে। একই সঙ্গে আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ঘোষণামূল্য কম দেখানোর প্রবণতাও কমে আসবে বলে ধারণা বাজেট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন আমদানি নীতিতে ১০ বছরের পুরোনো ইলেকট্রিক্যাল ভেহিক্যাল আমদানি করার সুযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়ায় ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশে ইভি খাতে বিপর্যয় দেখা দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে দেশীয় ইভি খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বড় আঘাত হতে পারে।

তারা বলছেন, নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে দেশকে পুরোনো ব্যাটারি ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে। এরই মধ্যে এনবিআর পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক স্কুল বাস আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি দিয়েছে। আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আরও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসছে। এ প্রেক্ষাপটে আমদানি নীতির খসড়া আদেশ বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি করবে।

ইলেকট্রিক গাড়ির বর্তমান পরিস্থিতি ও আগামী বাজেটে প্রত্যাশা নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, আমদানি নীতিমালায় ১০ বছরের পুরাতন ইলেকট্রিক কার আনার একটি খসড়া প্রস্তাব ছিল। তবে, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ওটা নিয়ে আমাদেরও আপত্তি রয়েছে। আশা করছি ওটা পরিবর্তন হবে। আমরা মূলত পাঁচ বছরের রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানির সুযোগ চেয়েছিলাম।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে গাড়ির বাজারে বিগত ৫০ বছরে প্রযুক্তিগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। সেখানে ফসিল ফুয়েল থেকে হাইব্রিড হয়েছে। হাইব্রিডে আমরা ভালো করছি। ইতোমধ্যে ৬০-৭০ শতাংশ হাইব্রিড গাড়ি চলে আসছে। এটার টেকনোলজিক্যাল পাওয়ার ও সার্ভিসসহ সব ধরনের সাপোর্টও রয়েছে। সেখানে ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে ওই সাপোর্ট শূন্য। এখন পর্যন্ত ৩০০ এর মতো গাড়ি এসেছে। এ বিষয়ে অবকাঠামোগত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ ইত্যাদি বিষয়ে মানুষ ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। সে কারণে আমরা চাচ্ছি হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিডকে যেন প্রাধান্য দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইভির দিকে যাওয়া যায়। ব্রিটেনসহ উন্নত দেশ এই প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। হুট করে যাওয়া যাবে না। হাইব্রিডও এক ধরনের ইলেকট্রিক গাড়ি। পুরোপুরি ইলেকট্রিক গাড়ির অবকাঠামো এখনও বাংলাদেশে তৈরি হয়নি।

আমদানি নীতির খসড়া আদেশে যা বলা হয়েছে

আমদানি নীতির খসড়া আদেশের পঞ্চম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের অধিক পুরোনো গাড়ি, মোটর কার, প্যাসেঞ্জার কার ও ট্রাক আমদানি করা যাবে না। তবে, ইলেকট্রিক্যাল ভেহিক্যাল আমদানির ক্ষেত্রে ১০ বছরের অধিক পুরাতন গাড়ি আমদানি করা যাবে না।

কোনো আমদানিকারক যানবাহনের বয়সসীমা ও অন্যান্য শর্ত লংঘন করে কোনো যানবাহন আমদানি করলে তা সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তযোগ্য হবে। বাজেয়াপ্ত যানবাহন নিলামকারী কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে স্ক্র্যাপ হিসাবে নিলামে বিক্রয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। সৌজন্যে ঢাকা পোস্ট