থার্ড টার্মিনাল চালুর জট কাটলো, ৭৩ শতাংশ রাজস্ব পাবে জাপান

Passenger Voice    |    ০৫:১৭ পিএম, ২০২৬-০৫-২১


থার্ড টার্মিনাল চালুর জট কাটলো, ৭৩ শতাংশ রাজস্ব পাবে জাপান

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে চালুর পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। পরিচালনাসংক্রান্ত প্রায় সব প্রক্রিয়া শেষ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এখন বাকি শুধু পরিচালনা চুক্তি। আগামী ১৬ জুলাই চুক্তি সই হতে পারে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। আর সরকারের লক্ষ্য, আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল উদ্বোধন করা।

বেবিচকের সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, “সবকিছু প্রায় চূড়ান্ত। গত ১৭ মে জাপানি প্রতিষ্ঠানকে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) জমা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪২ দিনের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা। সে হিসাবে জুনের মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করছি ১৬ জুলাই চুক্তি সই হবে। সরকার ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নানা জটিলতা ও কয়েক দফা দরকষাকষির পর থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পথে। বহুল আলোচিত এই টার্মিনালের রাজস্ব ভাগাভাগিতে বড় অংশ পাচ্ছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, পরিচালনাসংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান খাত থেকে আদায় হওয়া রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান এবং ২৭ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ।

সূত্রগুলো বলছে, টার্মিনালের অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর আগেই শেষ হলেও পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, আয় বণ্টন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে চালুর প্রক্রিয়া আটকে ছিল। সম্প্রতি সরকার জাপানি পক্ষের প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার পর আলোচনা নতুন গতি পায়। অতিরিক্ত কাজের বিল পরিশোধও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এরপর বাংলাদেশ সরকার ও জাপানি পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে পরিচালনা কাঠামো, সেবার মান, আন্তর্জাতিক অপারেশন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং রাজস্ব বণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

চূড়ান্ত প্রস্তাব অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালের চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—এমবার্কেশন ফি, দোকান ও লাউঞ্জ ভাড়া, কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ এবং কার পার্কিং ভাড়া থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব থাকবে জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে। এসব খাত থেকে অর্জিত আয়ের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান, আর বাংলাদেশ পাবে ২৭ শতাংশ।

তবে বিমানবন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত সরাসরি বেবিচকের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে ওভারফ্লাইং চার্জ ও বিমান অবতরণ ফি। এছাড়া কাস্টমস, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রমও বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। ফলে কৌশলগত ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিষয়টি নিয়ে সরকারের ভেতরেও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে দেশের আর্থিক স্বার্থ, জাইকার ঋণ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে নীতিনির্ধারকরা সতর্ক অবস্থান নেন। একাধিক দফা আলোচনার পরই বর্তমান কাঠামোয় দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাপানি পক্ষ তাদের প্রস্তাবে যাত্রীসেবা, কার্গো ব্যবস্থাপনা, এমবার্কেশন ফি, অগ্রিম ফি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো উপস্থাপন করেছে। তাদের দাবি, এই মডেল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবে। একইসঙ্গে জাইকা ঋণ পরিশোধের চাপও তুলনামূলক কমবে।

এছাড়া দ্রুত অপারেশন চালু, বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, কার্গো সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলেও মনে করছেন তারা।

এর আগে বিভিন্ন বৈঠকে জাপানি প্রতিনিধিরা টোকিওর হানেদা ও নারিতা বিমানবন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তাদের দাবি, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী ১৫ বছরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ও কার্গো সক্ষমতা দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান অগ্রগতিতে ডিসেম্বরেই টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

থার্ড টার্মিনাল চালু হলে দেশের বিমান পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে যাত্রীসেবা আরও আধুনিক ও গতিশীল হবে। বাড়বে যাত্রী ধারণক্ষমতা। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পরিচালনাও সহজ হবে। একই সঙ্গে কার্গো পরিবহন ব্যবস্থায় গতি আসবে, যা দেশের রফতানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।