শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:০৯ এএম, ২০২৬-০৫-২০
আগের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও উন্নয়ন ব্যয় টিকিয়ে রাখতে ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে অতীতে নেওয়া বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধেও গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। কিন্তু এর বিপরীতে সরকারের আয় বাড়ছে তুলনামূলক ধীরগতিতে। ফলে একদিকে যেমন ঋণের বোঝা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সুদ পরিশোধের চাপও।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের সরকারি মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণ রয়েছে ১০১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, আর বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর এই ঋণে সুদ ব্যয়ের অঙ্ক যেভাবে বাড়ছে, তাতে বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা, নতুন উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনা এবং আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া সরকারের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখা, রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে সরকারকে এখন বাজেটে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৪ টাকা বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে শুধু সুদ পরিশোধে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের বাজেটে একক খাত হিসেবে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় ধরা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৭০ শতাংশই চলে যাবে পুরোনো ঋণের সুদ শোধ করতে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের সুদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
যদিও অর্থনীতিবিদেরা দাবি করেছেন, দেশে বর্তমানে বিদেশি ঋণে গড়ে ওঠা মেগা প্রকল্পসহ অনেক প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় তার মাসিক কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ডলারের বাজারও অস্থিতিশীল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণও ধারাবাহিক বাড়ছে, যেগুলোর কিস্তি সুদসহ প্রতিমাসে পরিশোধ করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয়ের পরিমাণ শতাংশের হিসাবে আরও দু-তিন শতাংশ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী এ বিষয়ে বলেন, সুদ ব্যয় বাড়া মানে সরকারের হাতে অন্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যাওয়া। কারণ, বাজেটের একটি বড় অংশ বাধ্যতামূলকভাবে ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে চাপ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত বরাদ্দ কমে যাচ্ছে।
এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। তখন বাজেটের সংশোধিত ব্যয়ের মোট আকার ছিল ৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে, ওই সময় প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদ গুনতেই চলে গেছে ১৬ টাকা। আর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের মোট আকার ছিল ৭ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। যেখানে সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ওই সময়ও প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের খাতে ১৭ টাকার বেশি চলে গেছে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে।
অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় সরকারকে ধারনির্ভর ব্যয়ের পথেই থাকতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার বড় আকারের ঘাটতি বাজেট করছে। সেই ঘাটতি পূরণে দাতা দেশ ও সংস্থার পাশাপাশি দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে সুদ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতায় ডলারের দরে অস্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় সুদের হারও উঁচু পর্যায়ে রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তবে সরকারের পরিকল্পনা জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, এই ঋণ ও বাজেট ঘাটতি সরকার নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রাখতে চায়। এ লক্ষ্যে আগামীতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। কম সুদের বৈদেশিক ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে সুদ ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত