মেগা প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় খুলনা সিটি করপোরেশনের

Passenger Voice    |    ১১:৪০ এএম, ২০২৬-০৫-১৭


মেগা প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় খুলনা সিটি করপোরেশনের

খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন রাস্তা নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয়, নিম্নমানের কাজ ও ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইনের অভিযোগ রয়েছে। রাস্তা নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা অন্য প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া ড্রেনেজ সিস্টেমের ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইনের কারণে রাস্তার প্রশস্ততা কমে গেছে এবং নিম্নমানের সংস্কারকাজে দুই বছরের মধ্যে পিচ উঠে রাস্তায় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। 

২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) বাস্তবায়ন করা ‘গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা মেরামত ও সংস্কার মেগা প্রকল্পে’ অর্থ ব্যয় নিয়ে অনুসন্ধানে এসব তথ্য সামনে এসেছে।

জানা যায়, খুলনা নগরীর শিববাড়ি মোড় থেকে সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ব্যস্ততম মজিদ সরণির দৈর্ঘ্য ৮৮০ মিটার। ডান পাশে ৮৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ৭ মিটার প্রস্থের সড়কে বক্স কাটিং, সাব-বেজ কোর্স, প্রাইম কোট, কার্পেটিং ও মার্কিংয়ের কাজ করেছে খুলনা ওয়াসা। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। প্রতি স্কয়ার মিটারে ব্যয় হয় ২ হাজার ৩০৫ টাকা।

একই সড়কের অপর পাশে ৮৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ৭ মিটার প্রস্থের ‘গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত-উন্নয়ন প্রকল্পে’ কেসিসি ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার টাকা। এখানে প্রতি স্কয়ার মিটারে কেসিসি ব্যয় করেছে ৩ হাজার ৩৮৮ টাকা, যা প্রতি স্কয়ার মিটারে ১ হাজার ৮৮ টাকা বেশি। প্রকল্পের আওতায় ৩০২ কিলোমিটার সড়কে এভাবে বড় ধরনের অস্বাভাবিক ব্যয় ধরা হয়েছে। 

খুলনা ওয়াসার উপসহকারী প্রকৌশলী প্রশান্ত সমাজপতি জানান, পয়োনিস্কাশন প্রকল্পে মজিদ সরণি সড়কে ৯টির মতো ম্যানহোল তৈরি ও সংযুক্ত পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এরপর নির্ধারিত রেট অনুযায়ী সেখানে সাব-বেজ কোর্স, প্রাইম কোট, কার্পেটিং ও মার্কিংয়ের কাজ করা হয়। কেসিসি ও ওয়াসা দুই প্রতিষ্ঠান মিলে সড়কের এই অংশের মেরামতকাজে ব্যয় নির্ধারণ করে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। 

এদিকে ‘সড়কের এক পাশে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় হলে অপর পাশে ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা কেন ব্যয় হলো’–এমন প্রশ্নের জবাবে কেসিসির উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান মিঠু জানান, এই সড়কটির কিছু অংশ ভাঙা ও গর্ত ছিল। সেখানে ড্যামেজ পার্টে ম্যানুয়াল কার্পেটিং করা হয়। এ ছাড়া সড়কের দুই পাশে দেড় মিটার করে আরসিসি ঢালাই দিয়ে সড়ক প্রশস্ত করা হয়। সেখানে বক্স কাটিং ও বালু ফিলিং করা হয়। সবশেষে সড়কের বাম পাশে কার্পেটিং ও মার্কিংয়ের কাজও করা হয়। 

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সড়কের ডান পাশে ম্যানহোল ও পাইপ বসাতে খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যয়ের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। 

দুই প্রকল্পের টাকায় ব্যয় দেখানো হয় একই কাজে 
অভিযোগ রয়েছে, নগরীর শুধু মজিদ সরণি নয়, একইভাবে সামছুর রহমান রোড, টিবি ক্রস রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোডসহ বিভিন্ন স্থানে দুই প্রকল্পের টাকা রাস্তা মেরামতের কাজে ব্যয় দেখানো হয়েছে। কেসিসি প্রকল্পের আওতায় ৮৯ দশমিক ৪০ কিলোমিটার সড়কে কার্পেটিং, আরসিসি ১৭৫ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার এবং ৩৭ দশমিক ৬৮ কিলোমিটারে ব্যয় করেছে ৬৩১ কোটি টাকা। আবার ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পে রাস্তায় পাইপলাইন বসাতে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে ৩৭৮ কোটি টাকা। দুই প্রকল্পের ১ হাজার ৯ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হচ্ছে রাস্তা মেরামতের কাজে।

কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, এলজিডির রেট শিডিউল অনুযায়ী ওয়াসা ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করেছে। তাদের টাকা দিয়ে যে অংশে খোঁড়াখুঁড়িতে ক্ষতি হয়েছে, সেখানে মেরামতকাজ করা হয়েছে।

জানা যায়, ওয়াসার কাছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে স্কয়ার মিটারপ্রতি যে ৯ হাজার ৬১৯ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে, তা এলজিইডির গেজেট অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য নির্ধারিত। সমন্বয় করলে শতকোটি টাকা লুটপাট ঠেকানো যেত বলে দাবি করেছে সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে করে কাজ করতে নির্দেশনা দিলেও তা করা হয়নি। সিটি করপোরেশন ৪৩১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর ক্ষতিপূরণ বাবদ ওয়াসার কাছে ৩৭৮ কোটি টাকা দাবি করছে। এ ছাড়া ঢাকা সিটি করপোরেশনের গেজেট দিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের ক্ষতিপূরণের কাজ হিসাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে বলা হলেও তা করা হয়নি। মূলত প্রকল্পের শতকোটি টাকার লুটপাট ধামাচাপা দিতে ধূম্রজাল তৈরি করা হচ্ছে। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান। 

ঠিকাদার-কেসিসি সিন্ডিকেট
মজিদ সরণির মেরামত ও প্রশস্ত করার কাজে মোট প্রাক্কলন ব্যয় ছিল ৪ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এখানে সড়কের ডান পাশে ওয়াসা খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলে কেসিসি তার অংশের কাজের ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে শেষ করা কাজের জন্য ৩ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার টাকা প্রদান করেছে। এই সড়কের বাকি কাজের জন্য ৮৬ লাখ ৪০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু এর বদলে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি ও মেরামত বাবদ সড়কের ডান পাশে ব্যয় হয় আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সমন্বয় না থাকায় ৮৮০ মিটার রাস্তায় অর্থ অপচয় হয়েছে অর্ধকোটি টাকার বেশি। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বাড়তি অর্থ সুবিধা দিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনহীন কাজ দরপত্রে সংযুক্ত করা হয়। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত খোদ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লস্কর তাজুল ইসলাম ও প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান ঠিকাদারি কাজের নথিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ পেয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের কাজ ও কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তদন্তে যেসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত হয়েছে, তাদের মধ্যে হোসেইন ট্রেডার্স কাজ করেছে প্রায় ৫২ কোটি টাকার, তাজুল ট্রেডার্স কাজ করেছে ৪০ কোটি টাকার ও মেসার্স আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্স ৪৫ কোটি টাকার কাজ করেছে। 

অভিযোগ নিয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বিশেষ করে সাবেক সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন করে বেনামে কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করার অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া উন্নয়নকাজের চেক বা বিল উত্তোলনের জন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকে আধা শতাংশ হারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মেগা প্রকল্পগুলোতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন-বাণিজ্যের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল তোলার চেষ্টা বা নির্ধারিত প্রাক্কলনের চেয়ে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন ছিল 
খুলনা সিটি করপোরেশনের ‘গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক প্রকল্পে কার্পেটিং, সড়ক মেরামত ও উন্নয়ন খাতে মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে ৭৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ বাবদ ২৩০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবের ১০ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার বৃদ্ধি করে ৮৮ দশমিক ৮১ কিলোমিটার কার্পেটিং, সড়ক মেরামত ও উন্নয়নের জন্য ২৭১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৩ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। 

প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে ১৬৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার আরসিসি রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন খাতে ৩১৫ কোটি ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকার সংস্থান রাখা হয়েছিল। প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবিত ডিপিপিতে ১০ দশমিক ৪৯১ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ১৭৪ দশমিক ২৬ কিলেমিটার প্রস্তাব করা হয় এবং ব্যয় হ্রাস পায় ২ দশমিক ৪৭৭৪ কোটি টাকা। এই ব্যয় হ্রাসের বিষয়ে তারা জানান, চলমান ‘ড্রেনেজব্যবস্থা উন্নয়ন’ প্রকল্পের কারণে কিছু রাস্তার প্রশস্ততা কমে গেছে। কনসালট্যান্ট ড্রেনেজ স্ল্যাব যাতে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এ জন্য কিছু কিছু ড্রেন স্ল্যাব রোড বিয়ারিং হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। ফলে কিছু কিছু ড্রেনের ডিজাইনে ড্রেনের প্রশস্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ড্রেনসংলগ্ন রাস্তার প্রশস্ততা কমে গেছে। তবে বিশ্লেষকরা এটিকে ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, এর কারণে একদিকে সড়কের প্রশস্ততা কমে গেছে, অন্যদিকে রাস্তার সঙ্গে ড্রেনের স্ল্যাব একই লেভেলে থাকায় বৃষ্টির সময় ড্রেন উপচে ড্রেনের নোংরা পানিতে বাড়িঘর সয়লাব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

অস্বাভাবিক ব্যয় খতিয়ে দেখার আশ্বাস 
কেসিসির রাস্তা নির্মাণ মেগা প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা যাচাই করার দাবি তুলেছে সচেতন নাগরিক সমাজ। সিটি করপোরেশনের টেন্ডারে অনিয়ম ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। এ অবস্থায় অর্থের অপচয় ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, এগুলো জনগণের টাকা। এই টাকা কীভাবে অপচয় হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কার কী দায়িত্ব ছিল, সেটা ঠিকমতো পালন হয়েছে কি না–সব খতিয়ে দেখা হবে। জনগণের টাকার অপচয় হতে দেওয়া হবে না।  সৌজন্যে খবরের কাগজ