নিরাপদ পারাপারের ফুটওভার ব্রিজ এখন মরণফাঁদ

Passenger Voice    |    ১১:২৩ এএম, ২০২৬-০৫-১৭


নিরাপদ পারাপারের ফুটওভার ব্রিজ এখন মরণফাঁদ

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে নির্মিত হয় ফুটওভার ব্রিজ। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ফুটওভার ব্রিজে ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা, দখল, ভাঙাচোরা অবকাঠামো এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার চিত্র উঠে এসেছে। বছরের পর বছর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব ব্রিজ এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজের পাটাতন ও সিঁড়িতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও লোহার পাত উঠে গেছে, কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বিপজ্জনক গর্ত। অনেক ব্রিজের লোহার কাঠামো মরিচা ধরে ক্ষয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রায়ই পথচারীদের হাত-পা কেটে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।

রাতে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের দখলে 
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজধানীর অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ রাতে ছিনতাইকারী, মাদকসেবী ও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সন্ধ্যার পর থেকেই অনেক ব্রিজে শুরু হয় মাদকসেবীদের আড্ডা। এতে সাধারণ পথচারীদের নিরাপদে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে নির্জন ও অল্প আলোযুক্ত ব্রিজগুলোতে একা চলাচল করা নারী, শিক্ষার্থী ও অফিসফেরত মানুষকে টার্গেট করছে ছিনতাইকারীরা। মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হামলার ঘটনাও ঘটছে। কোথাও ছুরিকাঘাত, আবার কোথাও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে এসব ফুটওভার ব্রিজ কার্যত সমাজবিরোধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু মাদকসেবনই নয়, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ব্রিজ এখন ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল পরিণত হয়েছে।  ফলে সন্ধ্যার পর অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি সড়ক পার হচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রাজধানীর পরীবাগ ফুটওভার ব্রিজে গিয়ে দেখা গেছে করুণ অবস্থা। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সংস্কারবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকা ব্রিজটির মূল পাটাতনের লোহার পাত মরিচা ধরে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। নিচ দিয়ে দ্রুতগতির বাস-ট্রাক চলাচল করছে, আর গর্তের ফাঁক দিয়েই দেখা যাচ্ছে ব্যস্ত সড়ক। অসাবধানতাবশত পা পিছলে গেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বর্তমানে ফুটওভার ব্রিজটি কোনোভাবেই আর ব্যবহারের উপযোগী নয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে ব্রিজটি মাদকসেবী ও মাদককারবারিদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। ভাঙাচোরা ব্রিজজুড়ে পড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা ও মল-মূত্র। সাধারণ মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় অপরাধীদের দখল আরও বেড়েছে।

পরীবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, শুরুর দিকে হাজার হাজার মানুষ এ ব্রিজটি ব্যবহার করত। এখন হাতেগোনা কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করছেন। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে কোনো সংস্কার নেই। রাতে তো অবস্থা আরও ভয়ংকর হয়। ছিনতাই ও মাদকসেবীদের কারণে অনেকেই এখন ব্রিজ ব্যবহার করতে ভয় পান।

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফুটওভার ব্রিজেও একই চিত্র দেখা গেছে। কবি সুফিয়া কামাল হলসংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাইকোর্ট মাজার থেকে বঙ্গবাজারগামী এই গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

ব্রিজটির সিঁড়িগুলো ভাঙাচোরা ও মরিচাধরা। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। অসাবধানতাবশত কারও পা পিছলে গেলে সরাসরি নিচে পড়ে গুরুতর দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সংস্কার হয় না ব্রিজটি। এখন সেটি মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। রাতের বেলায় তারা সেখানেই অবস্থান নেয় এবং পুরো পরিবেশ নোংরা ও দুর্গন্ধময় করে তোলে।

ঢাবি শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, ফুটওভার ব্রিজগুলো মানুষকে নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন এগুলোই আতঙ্কের জায়গা হয়ে গেছে। সিঁড়ি ভাঙা, ময়লা-আবর্জনা, অন্ধকার পরিবেশ- সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল খুবই কষ্টকর। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এটির দ্রুত সংস্কার ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

অন্যদিকে পান্থপথে বসুন্ধরা সিটির পাশের ফুটওভার ব্রিজটিও এখন অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজটিতে দেখা গেল জমে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। দিনের বেলাতেই সেখানে প্রকাশ্যে মাদকসেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভবঘুরেরা রাত কাটাচ্ছে ব্রিজের ওপরেই। সন্ধ্যার পর স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি সড়ক পারাপার করছেন।

নিকুঞ্জ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের ওপর নির্মিত ফুটওভার ব্রিজটিও দীর্ঘদিনের অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পোড়া দাগ, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ও নড়বড়ে কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্রিজ এখন পথচারীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়দের দাবি, চার বছরের বেশি সময় ধরে কোনো ধরনের সংস্কারকাজ হয়নি। ফলে, যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
ফুটওভার ব্রিজগুলোর বেহাল অবস্থার বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাই অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, আমরা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ১০টির কাজ চলছে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে শনিবার থেকে কাজ শুরু হবে। বাকি ব্রিজগুলোর বিষয়েও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সিটি করপোরেশন একা সবকিছু ঠিক রাখতে পারে না। মানুষ সচেতন না হলে এসব উদ্যোগ সফল হয় না। নিয়মিত পোস্টার লাগানো, ময়লা-আবর্জনা ফেলা, ফুটওভার ব্রিজের বিভিন্ন অংশ নষ্ট করা, এমনকি সিসিটিভি ক্যামেরা ও লাইট চুরি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে প্রতিদিন। তাই নাগরিক সচেতনতাও জরুরি। এটি আমাদেরই শহর- এ ভাবনা সবার মধ্যে থাকতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে তিনি গণমাধ্যমের সাহায্য চেয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা। আমাদের আওতাধীন যেসব ফুটওভার ব্রিজে সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে।’ তবে কবে নাগাদ সংস্কারকাজ শুরু হবে- এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি তিনি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ফুটওভার ব্রিজের কার্যকর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা ও জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে মানুষ এখন এসব ব্রিজের ব্যবহার এড়িয়ে চলছেন। ফলে ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি রাস্তা পারাপারের প্রবণতা বাড়ছে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নগরপরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের ফুটওভার ব্রিজের যদি এমন বেহাল হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলে আর কিছু থাকে না। নগরবাসীর জন্য ফুটওভার ব্রিজ করা হলো, কিন্তু তদারকি ও সংস্কারের অভাবে সেগুলো এখন জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল! বছরে এত এত প্রকল্পের বরাদ্দ হচ্ছে কিন্তু মানুষের কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না কেন? এর জবাব দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, দ্রুত এসব ঝুঁকিপূর্ণ ফুটওভার ব্রিজ চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে সেগুলো সংস্কার করে নগরবাসীর চলাচলের উপযোগী করা প্রয়োজন।