শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৪১ এএম, ২০২৬-০৫-১৫
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াভিত্তিক ৫ ব্যাংককে এক ব্যাংকে রূপান্তর প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে দুটি ব্যাংক। এদিকে ব্যাংকটি পরিচালনা করতে চাইলে আগামী বাজেটে সরকারকে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দিতে হবে–এমন বাস্তবতায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে সরকার। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) এবং এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংক দুটি আলাদাভাবে পরিচালনা করতে চান শুরুর দিকের বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা। তবে ব্যাংক দুটিকে এই সুযোগ দিতে রাজি নয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগতভাবে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা আগের মতোই এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের সাবেক মালিকপক্ষ যে আবেদন জমা দিয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। এ ছাড়া তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে ১০ বছর সময় চেয়েছেন, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ আবেদনটি নাকচ করার পক্ষে মত দিয়েছে। একই সঙ্গে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ অনুযায়ী একীভূতকরণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, অগ্রগতি খুব বেশি হয়নি। যেহেতু এখন পর্যন্ত কোনো দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী এগিয়ে আসেনি, ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক আগের সিদ্ধান্তেই অটল আছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একীভূতকরণ কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১২’শ কোটি টাকা দিতে হবে। এরপর আগামী দুই বছরের মধ্যে বাকি সাড়ে ৯২ শতাংশ টাকাও ফেরত দিতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতির টাকাও দিতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারলেই ব্যাংকটি তারা স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারবে। যদিও এসআইবিএল এবং এক্সিম ব্যাংকের আবেদনে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্ম পরিকল্পনা নেই। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে সেটি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে।
তাহলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন সরকারি মালিকানায় চলবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি মালিকানায় চালাতে হলে আগামী বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। সেটি সম্ভব কিনা তা সরকার বিবেচনা করবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে সংশোধিত আকারে আইনে রূপান্তরের সময় ১৮ (ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে সাড়ে ৭ শতাংশ টাকা দিয়ে ব্যাংকের আগের পরিচালকদের মালিকানায় ফেরার সুযোগ রয়েছে। এই ধারাটি বিলুপ্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
আগামী সপ্তাহেই এমডি নিয়োগের সম্ভাবনা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের কাজও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এমডি নিয়োগে আগ্রহী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। দুই দফায় প্রায় ১১ জন ব্যাংক কর্মকর্তা এই সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করেছেন। আগামী সপ্তাহেই এমডি নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি সংশোধন করে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ হিসেবে কার্যকর করা হয়।
এই আইনের আওতায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক, যা দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে পরিণত হওয়ার কথা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত বিমা তহবিল থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দিয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আর সরকার যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে, সেখান থেকে আবার ১০ হাজার কোটি টাকা সরকার ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া ব্যাংকটিতে সরকারি তহবিল রাখা, আকর্ষণীয় মুনাফা দিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ রাখতে উদ্বুদ্ধ করা এবং ঋণ আদায়সহ বিভিন্নভাবে তারল্য প্রবাহ বাড়ানোর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।
আমানতকারীরা কবে টাকা পাবেন!
পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন। এসব আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে একটি স্কিম ঘোষণা করেছে। এই স্কিমের আওতায় প্রাথমিকভাবে আমানত বিমা সুরক্ষা আইনে যেকোনো আমানতকারীকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর যাদের আমানত দুই লাখ টাকার বেশি, তাদের ক্ষেত্রে অর্থ তোলা যাবে কিস্তিতে। শুধু চলতি ও সঞ্চয়ী আমানত নির্দিষ্ট মেয়াদে তুলতে পারবেন গ্রাহকরা। এ ক্ষেত্রে পুরো টাকা তুলতে ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।
সাধারণ আমানতকারীদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে পরবর্তী এক লাখ টাকা পর্যন্ত স্কিম কার্যকর হওয়ার তিন মাস পর তোলা যাবে। এরপর ১ লাখ টাকা করে স্কিম কার্যকরের পরের ৬ মাস, ৯ মাস, ১২ মাস, ১৫ মাস, ১৮ মাস, ২১ মাস পর তোলা যাবে। বাকি পুরো অর্থ তোলা যাবে ২৪ মাস পর। এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের চলতি, সঞ্চয়ী আমানতের ক্ষেত্রেও একই সূচি প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। তার ওপর সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর যে হেয়ার কাট পদ্ধতির মাধ্যমে আমানতকারীদের ২০২৩-২০২৪ সালের সুদহার কেটে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন, সেটিও এখন পর্যন্ত বাতিল করেনি সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ভুক্তভোগী আমানতকারীরা নানাভাবে বিক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব আলিফ রেজা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে গাইডলাইন দেওয়া হয়েছিল, সেই অনুযায়ী আমরা আমানত পাচ্ছি না। ফলে আমরা সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের টাকা ব্যাংকে থাকার পরও অর্থের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছি। অথচ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক তেমন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। তাই আগামী মাসে আমরা আবার ব্যাংক ঘেরাওসহ বেশকিছু কর্মসূচি পালন করব।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত