কঠিন সংকটেও গ্রাহকের আস্থায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

Passenger Voice    |    ০৪:২০ পিএম, ২০২৬-০৫-১৪


কঠিন সংকটেও গ্রাহকের আস্থায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

নতুন বছরের শুরুতেই ঝুঁকি কাটিয়ে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংকটিকে কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি। একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রাহকের চেক ডিজঅনার হয়নি, বরং ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে গ্রাহক সংখ্যা, অব্যাহত রয়েছে মুনাফা অর্জনের ধারা।

কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংকের আমানত, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য স্থিতিশীল রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নেওয়া কিছু রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের কারণে সাময়িকভাবে কিছু সূচকে স্থবিরতা এলেও বর্তমানে তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত এক বছরে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। সিস্টেম আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং আরও নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।

পাশাপাশি অ্যাজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামী ব্যাংকটি আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গ্রাহকের আমানত সুরক্ষার লক্ষে ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ছিল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকও। পরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকির জন্য স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পর্যায়ের ৬ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যার মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন। এসব কারণে ২০২৫ সালজুড়ে ব্যাংকটির কার্যক্রমে অস্থিরতা দেখা দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার অডিটে বড় ধরনের আর্থিক লুটপাটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ব্যাংকটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৫১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংকটের মধ্যেও প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে। একইভাবে গ্রাহক হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৭টি, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৪০টি। এক বছরে হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ২৯ হাজারের বেশি।

২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা ছিল ৪৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে নতুন যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হিসাব। গত এপ্রিল শেষে ব্যাংকের মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪৫ হাজারে। এ সময়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগ স্থিতিশীল রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কখনো তারল্য সংকটে পড়েনি। ফলে অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। যেখানে অনেক ব্যাংক গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ছোট অঙ্কের চেকও ডিজঅনার করেছে, সেখানে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের কোনো চেক ডিজঅনার হয়নি। গ্রাহকের যেকোনো পরিমাণ টাকার চেক পরিশোধে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের সময়েও এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যেখানে গ্রাহক সেবা না পেয়ে ব্যাংকের শাখা থেকে ফিরে গেছেন। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাংকটি নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়নি।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ আরও সুগম হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ‘আবাবিল এনজি’ চালু করা হয়। এর ফলে লেনদেন আরও নিরাপদ, দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল হয়েছে। পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এটিএম, বিএফটিএন, আরটিজিএস ও এনপিএসবি সেবার কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতাও বেড়েছে।

এছাড়া দেশের ৩০৬টি উপজেলায় বিস্তৃত ৭৩৮টি অ্যাজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্যাংকটি। গত ১৬ মাসে অ্যাজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার। মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৮ শতাংশ আউটলেট গ্রামীণ এলাকায় এবং মোট গ্রাহকের ৪৯ শতাংশ নারী।

গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যে আল-আরাফাহ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এআরডিপি) আওতায় বর্তমানে ২ হাজার ৭৮০টি গ্রামে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এ কর্মসূচির সদস্য সংখ্যা ৮৬ হাজারের বেশি, যার ৭২ শতাংশ নারী। গত ১৬ মাসে প্রায় ৩০ হাজার নতুন হিসাব যুক্ত হয়ে মোট হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০টিতে। একই সময়ে আমানত বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বর্তমানে এই প্রকল্পের আমানত ৭৫০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ৫৪১ কোটি টাকা।

একই সঙ্গে শরিয়াহভিত্তিক সমন্বিত ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে ব্যাংকটি। এর আওতায় ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইসলামিক ওয়ালেট, বাংলা কিউআর, অ্যাজেন্ট ব্যাংকিং এবং এআরডিপিকে একই নেটওয়ার্কে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে সঞ্চয়, দান, শিক্ষা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম ক্যাশলেস করা সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে সারা দেশে ২২৬টি শাখা, ৮৯টি উপশাখা ও ৭৩৮টি অ্যাজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে আধুনিক গ্রাহকসেবা দিচ্ছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।

ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু তা ফিরে পাওয়া কঠিন। সেই কঠিন পথই ধীরে ধীরে অতিক্রম করছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। নানা চ্যালেঞ্জ, অস্থিরতা ও গুজবের মধ্যেও ব্যাংকটি গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে- এটাই সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংকটের সময়েও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি, কোনো গ্রাহকের চেক ডিজঅনার হয়নি। বরং আমানত, বিনিয়োগ ও গ্রাহক সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠানকে আবারও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।’

ডিজিটাল ব্যাংকিং, অ্যাজেন্ট ব্যাংকিং এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে অগ্রগতি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন তিনি।

রাফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংকটকে আড়াল না করে সংস্কারের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জীবনেই চ্যালেঞ্জ আসে। তবে সঠিক নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা ও গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্যোগ থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব- আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এখন তারই একটি উদাহরণ।’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইতিবাচক পরিবর্তনের এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং গ্রাহকের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।