শিরোনাম
Passenger Voice | ০৩:৪৬ পিএম, ২০২৬-০৫-০৮
দুপুরের ব্যস্ত সড়ক। কোথাও স্কুল ছুটির ভিড়, কোথাও বাজার শেষে বাড়ি ফেরার তাড়া। প্রতিদিনের মতোই মানুষ হাঁটে, রাস্তা পার হয়; মেলাতে থাকে জীবনের ছোট ছোট হিসাব। এরই সঙ্গে বয়ে চলে নীরব ঝুঁকি। যে ঝুঁকি মুহূর্তেই কেড়ে নেয় জীবন, ভেঙে দেয় পরিবার। আর এসব ঝুঁকির অন্যতম শিকার নারী ও শিশু।
এই তো দুদিন আগে, গত রোববারের কথা। স্কুলে বাজল ছুটির ঘণ্টা। অন্য দিনের মতো বইখাতা গুছিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে বাড়ির পথে রওনা হলো তানভীর। দূরে নয়—কয়েক মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। জীবন থেকেই ছুটি হয়ে গেল ওর।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ একটি কাভার্ডভ্যান পেছন দিক থেকে আসতে শুরু করে। আশপাশের মানুষের চিৎকারে গাড়িটি থামলেও ততক্ষণে সব শেষ। আট বছর বয়সী তানভীর ইসলামের জীবন থেমে যায় সেখানেই।
তানভীরের এ মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, হাহাকার। দিনাজপুর থেকে গাজীপুরে এসে বাবা সজল ইসলাম ভাড়া বাসায় থেকে দিনমজুরির কাজ করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও বড় ছেলে তানভীরকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করার স্বপ্ন-ইচ্ছা ছিল তার। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে সজল ইসলাম শুধু বলতে পারছিলেন, ‘আমার দুই সন্তান। তানভীর ছিল বড়। ওকে নিয়ে অনেক আশা ছিল।’
ছোট্ট একটি ঘরে এখনো তানভীরের স্কুল ব্যাগ, খাতা আর বই পড়ে আছে। মা বারবার সেই ব্যাগের দিকে তাকান। প্রতিদিন যে ছেলে স্কুল শেষে ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে গল্প করত, আজ সেই জায়গাটা নিঃশব্দ।
একই দিনের আরেকটি ঘটনা। মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া বাজার তখন দিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা—সবজি, মাছ, নিত্যপণ্যের ভিড়ে মানুষের আনাগোনা। কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পপি খাতুন। হাতে বাজারের ব্যাগ, মাথায় সংসারের হিসাব, আর চোখে ছিল দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়া।
রাস্তা পার হওয়ার জন্য তিনি দাঁড়ান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যানবাহনের ফাঁক গলিয়ে এগোনোর চেষ্টা করছিলেন। ঠিক সে মুহূর্তে মাগুরা থেকে যশোরগামী একটি লোকাল বাস দ্রুতগতিতে এসে তাকে ধাক্কা দেয়। সময়ের ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য, কিন্তু তার ফল ছিল চূড়ান্ত। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৩৮ বছর বয়সী পপি খাতুনের।
পপি খাতুন মাগুরা সদর উপজেলার রাজিবের পাড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্বামী প্রবাসে থাকায় সংসারের দায়িত্ব মূলত তার কাঁধেই ছিল। পরিবারের জন্য বাজার করতে বের হওয়া এই নারী আর কখনো ফিরে যাননি ঘরে। যে সাধারণ একটি দুপুর ছিল তার জীবনের অংশ, সেটিই হয়ে যায় শেষ দুপুর।
আড়পাড়া বাজারের এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের অনেক ব্যস্ত বাজার, সড়ক মোড় এবং পথচারী চলাচলের জায়গায় প্রতিদিনই একই ধরনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ রাস্তা পার হয়। নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন চলাচল এবং কার্যকর নজরদারির অভাবে এমন প্রাণহানি ঘটছে নিয়মিতই।
এ শুধু দুটি ঘটনা নয়। দুটি পরিবারের ভালোবাসা, আঁকড়ে ধরে বাঁচার যে আকুতি—তা যেন নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত চিত্র। এমন পরিস্থিতি প্রায় প্রতিদিনই ঘটে যাচ্ছে। ছবিটা কত ভয়ংকর! তা এক বাক্যের পরিসংখ্যানেই বোঝা যায়। সারা দেশে গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা গেছে, তার প্রায় ২৯ শতাংশ নারী ও শিশু।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৩৫ হাজার ১৭৪ জন মারা গেছে। নিহতদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জনই নারী ও শিশু। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯০ নারী ও ২১৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণ ও ধরনে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে দেশের সড়ক ও পরিবহন শিশুবান্ধব না হওয়া। এ ছাড়া সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের মধ্যে সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি দুর্ঘটনায় আহতদের উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটও রয়েছে।
নারী ও শিশুর সড়ক দুর্ঘটনায় ঝুঁকি বাড়ার পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন ‘নিজেরা করি’ এর সমন্বয়ক খুশী কবির। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সমাজে এখনো নারীদের ওপর পরিবার ও সন্তানের দায়িত্বের বড় অংশই বর্তায়। ঘরের কাজ সামলানো, শিশুকে দেখভাল করা—সবকিছুর চাপ নিয়ে যখন তারা বাইরে বের হন, তখন তাদের চলাচলে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের অসুবিধা ও অস্বস্তি কাজ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ নারী এখনো ঘরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করেন। ফলে রাস্তায় বের হলে তাদের মধ্যে ভয় ও অনভ্যস্ততা দেখা যায়। অন্যদিকে, পুরুষরা প্রতিদিন বাইরে চলাফেরা করতে করতে সড়ক ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এ অভ্যস্ততার পার্থক্য নারী ও শিশুকে সড়কে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে।’
খুশী কবির উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার মূল কারণ শুধু সামাজিক নয়, বরং সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের অনেক চালকই অদক্ষ এবং অনেকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। অধিকাংশ গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক—ইঞ্জিন ও ব্রেক ঠিকভাবে কাজ করে না, অনেক যানবাহনই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলাচল করছে। এর পাশাপাশি বেশি ট্রিপ দেওয়ার আশায় অনেক চালক পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়েই দীর্ঘসময় গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই সমাজকর্মীর মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বিদ্যমান আইন ও নিয়ম যেন দুর্নীতির কারণে ভেঙে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাস মালিকদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।
টানা পাঁচ বছরের নারী ও শিশু মৃত্যুর হিসাব করে পাওয়া গেছে, ২০২১ সালে ৯২৭ নারী ও ৭৩৪ জন শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। একইভাবে ২০২২ সালে ১ হাজার ৬১ নারী ও ১ হাজার ১৪৩ জন শিশু; ২০২৩ সালে ৯৭৪ নারী ও ১ হাজার ১২৮ জন শিশু; ২০২৪ সালে ৮৯৩ নারী ও ১ হাজার ১৫২ জন শিশু এবং ২০২৫ সালে ৯৬২ নারী ও ১ হাজার ৮ জন শিশু মারা গেছে।
অঙ্কের হিসাব বলছে, এ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী মারা গেছে ২০২২ সালে, যা ওই বছরের মোট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ১৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি শিশু মারা গেছে ২০২৪ সালে, যা ওই বছরে মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুদের উচ্চ মৃত্যুহারের পেছনে একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। তিনি বলেন, ‘দেশের সড়ক ব্যবস্থা এখনো মূলত গাড়িকেন্দ্রিক। ফলে পথচারী, বিশেষ করে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পায় না। নিরাপদ ফুটপাত, স্কুল জোনে নিয়ন্ত্রিত গতি এবং নিরাপদ পারাপারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চালকদের দুর্বল প্রশিক্ষণ, ত্রুটিপূর্ণ লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত গতি এবং বেপরোয়া ড্রাইভিং। পাশাপাশি দায়মুক্তির সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তা এখন বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আঘাত কমানোর লক্ষ্য থাকলেও বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে।’
বর্তমান আইন ও নীতিমালায় কিছু অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও এর প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি সীমিত হওয়ায় নিয়মভঙ্গের শাস্তি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় না। নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা, যেমন স্কুল জোনে স্পিড কন্ট্রোল বা নিরাপদ গণপরিবহন—এসব ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।’
চালকদের শারীরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষিত বলে জানান তিনি। তার মতে, নিয়মিত দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা নিশ্চিত করা হলে অনেক চালককে প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা ব্যবহার করতে দেখা যেত। বাস্তবে চশমা ব্যবহারকারী চালকের সংখ্যা কম, যা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
এ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। প্রথমত, স্কুল, বাজার ও আবাসিক এলাকার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে ‘লো-স্পিড জোন’ কার্যকর করা। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সিং ও চালক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কঠোর সংস্কার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। তৃতীয়ত, সড়ক নিরাপত্তাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে গণসচেতনতা বাড়ানো।
তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা অনিবার্য নয়, এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রতিটি প্রাণহানি নীতিগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন। তাই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এদিকে হিসাবের আরেক হিসাব বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নারীর মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি বছর এক হাজারের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছে। যদিও আশঙ্কাজনকভাবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি বছর বেড়ে চলছে।
শিশু মৃত্যুর ধরন পর্যালোচনায় বোঝা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময়, বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় নিহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়ি ঘেঁষা। ঘরের দরজা খুললেই সড়ক—এমন অবস্থা! এসব সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকে না। ফলে যানবাহনগুলো বেপরোয়াভাবে চলাচল করে। আবার সড়ক ব্যবহারের বেশিরভাগ শিশুই কোনো নিয়মনীতি জানে না। এসব অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে শিশুরা নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে।
জানতে চাইলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘শিশুদের মাঝে সড়ক নিরাপত্তা বা সড়কের চলাচলের বিষয়ে তেমন জানাশোনা থাকে না। ফলে সড়ক কীভাবে ব্যবহার করতে হবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা সেটিই জানে না। শিশুরা ঘরের কাছাকাছি বেশি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়। স্কুলে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা জরুরি। আর ভয়াবহ দিক হলো, অনেক কিছুর পরও সড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না। পরিসংখ্যানে নারী ও শিশু মৃত্যুর ছবিটিও আতঙ্কের।’ সূত্র কালবেলা
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত