চরম অনিশ্চয়তায় ৫ ইসলামি ব্যাংক

Passenger Voice    |    ১০:৫৭ এএম, ২০২৬-০৫-০৭


চরম অনিশ্চয়তায় ৫ ইসলামি ব্যাংক

ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন যে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে, তা বর্তমানে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একদিকে ব্যাংকটি বর্তমানে কার্যক্রম শূন্য অবস্থায় আছে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাদের আমানত ফেরত না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমানত ফেরত পেতে তারা এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল বুধবারও চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আমানতকারীরা মানববন্ধন করেছেন। 

গঠনের সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এ ব্যাংকে এমডি নিয়োগ হয়নি। পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রায় তিন মাস পর তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। ফলে বর্তমানে এই ব্যাংক চেয়ারম্যান ও এমডিশূন্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচজন নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের কারও ইসলামি ধারার ব্যাংকিং পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। 

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হলেও বর্তমান সরকার ১৮ (ক) ধারা যুক্ত করে জাতীয় সংসদে আইন পাস করে। যেখানে সাবেক পরিচালকদের আবার ব্যাংকের শেয়ার ফেরত পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই সুযোগে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) পর এক্সিম ব্যাংকও একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়। এই লক্ষ্যে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপনের নেতৃত্বে ব্যাংকটির সাবেক পর্ষদ গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। 

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮ (ক) ধারার আওতায় এই আবেদন করা হয়েছে বলে জানান নজরুল ইসলাম স্বপন। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবেদনটি গ্রহণ করেছে। সেখানে আমরা আমাদের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছি। এর আগে গত ২৭ এপ্রিল এসআইবিএল একই বিষয়ে আবেদন করে। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই ব্যাংকের এমন পদক্ষেপে একীভূত কাঠামোর কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।’

আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আবেদনটি সংশ্লিষ্ট বিভাগে গেলে যাচাই-বাছাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে ১৮ (ক) ধারার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, প্রাথমিকভাবে সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা দিতে হবে। এরপর আগামী দুই বছরের মধ্যে বাকি টাকাও ফেরত দিতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতির টাকাও দিতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারলেই ব্যাংকটি তারা স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারবে। 

এর আগে, সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একত্রিত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছিলেন। ব্যাংক পাঁচটি হলো এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এসআইবিএল। গঠনের তিন মাসের মাথায় ১৮ (ক) ধারা যুক্ত করে সংসদে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। আইন পাসের পর থেকেই ব্যাংকের সাবেক পরিচালকদের ফেরার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। চার মাসের মাথায় আলাদা হওয়ার জন্য প্রথম এসআইবিএল ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে। 

একীভূত প্রক্রিয়ার শুরুতে গত ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে সেগুলোকে ‘অকার্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই সময় আহসান এইচ মনসুর জানান, সম্পদের বিপরীতে দায় হিসাব করলে শেয়ারগুলো নেগেটিভ বা ঋণাত্মক হয়ে গেছে, তাই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শেয়ার শূন্য করা হয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মতামত ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সব মহলেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের সময় ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়। এতে সাবেক শেয়ারধারকদের পুনরায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ধারার ওপর ভিত্তি করেই এসআইবিএল এবং এক্সিম ব্যাংক আবেদন করেছে।

আবেদনে ব্যাংক দুটিকে পৃথক করে নতুন মূলধন জোগান, তারল্য উন্নয়ন এবং পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংক দুটি বলেছে, আলাদা হলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ কমিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার করা হবে এবং মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। এসআইবিএলের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পেলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি স্থগিত থাকা সরকারি ২২টি হিসাব পুনরায় সচল করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ফেরত আনার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এ ছাড়া ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য আগামী ১০ বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চেয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গতি বাড়াতে গতকাল এমডি নিয়োগের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত এমডি নিয়োগসংক্রান্ত কমিটিতে আরও রয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। গতকাল চারজন প্রার্থী সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদায় থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকে এমডির দায়িত্ব পালন করেন। 

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে এমডি নিয়োগের উদ্যোগ 
এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের লক্ষ্যে সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু করেছে সরকার। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারে ছয়জন ব্যাংক কর্মকর্তা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি জাফর আলম, সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি নুরুদ্দিন মো. ছাদেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির, সীমান্ত ব্যাংকের সাবেক এমডি রফিকুল ইসলাম, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ শাখার প্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এবং ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) জাকির হোসেন।

বিক্ষুব্ধ আমানতকারীদের আন্দোলন অব্যাহত
বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ইসলামি ধারার পাঁচটি ব্যাংককে দুর্বল ব্যাংক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর থেকেই এসব ব্যাংকে আমানত তোলার হিড়িক লেগে যায়। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিয়েও ব্যাংকগুলো গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়। সব শেষে এই ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগ নেন তিনি। কিন্তু এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই আমানতকারীরা তাদের আমানত তুলতে পারছেন না। টাকা না পেয়ে অনেকে চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। অনেকে মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমালেও টাকার অভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না। আবার অনেকে নিজের টাকা ব্যাংকে রেখেও অন্যের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনো রকমে দিন পার করছেন। সব মিলিয়ে আমানতকারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ফলে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন এই আমানতকারীরা। 

রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় আমানতকারীদের আমানত ফেরতের একটি গাইডলাইনও করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে প্রাথমিকভাবে আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে থাকা আমানত থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। এর ৩ মাস পর ১ লাখ টাকা করে তারা নিতে পারবেন। আর সব টাকা দুই বছরের মধ্যে ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল গাইডলাইনে। কিন্তু ভুক্তভোগী আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন না। ফলে তারা দিন দিন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। ফলে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে আমানতকারীদের আন্দোলন চলছেই। 

খবরের কাগজের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রামে কয়েক দিন ধরেই বিক্ষুব্ধ আমানতকারীরা আন্দোলন করছেন। গতকালও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তারা মানববন্ধন করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। আমানত ফিরে পাওয়ার দাবিতে নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন-চট্টগ্রাম বিভাগ’-এর ব্যানারে বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা। এরপর তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ে যান। তিন দফা দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেন তারা। 

জানা গেছে, গতকাল সকাল ১০টায় নগরীর নিউ মার্কেট মোড়ে জড়ো হন তারা। এ সময় আমানত ফিরে পাওয়ার দাবিতে নানা স্লোগান দেন। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং নিউ মার্কেট মোড়ে কর্মসূচি করার অনুরোধ করেন। পরে আমানতকারীরা সেখানে জিপিওর বিপরীতে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ে যান। তারা তিন দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেন। দাবিগুলো হলো টাকা ফেরতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বক্তব্য প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থাকা।

আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আমাদের দুষ্কৃতকারী বলছেন। এটি মানহানিকর বক্তব্য। এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। আমরা তাকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই। ভবিষ্যতে এমন মন্তব্য করার আগে ভেবে দেখতে হবে। পাশাপাশি হেয়ারকাট বাতিল করতে হবে। আমরা চাই স্বাভাবিক লেনদেন।’ এর আগে গত ৩ মে খাতুনগঞ্জ ও ৪ মে নগরের আগ্রাবাদে পাঁচ ব্যাংকের ৯টি শাখায় তালা দেন তারা। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংক হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে।

এদিকে আগামী ১৭ মে ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন ঢাকায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখা ঘেরাওসহ বড় ধরনের কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে গাইডলাইন দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী আমানত পাচ্ছি না। ফলে ১৭ মে আবার ব্যাংক ঘেরাওসহ বেশকিছু কর্মসূচি পালন করব।’  সৌজন্যে খবরের কাগজ