সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজন নিহত

‘ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, লাশ হইয়া ফিইরা আইলো’

Passenger Voice    |    ১২:১৩ পিএম, ২০২৬-০৫-০৬


‘ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, লাশ হইয়া ফিইরা আইলো’

সোমবার সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন ইউসুফ আলী (৫৫)। সঙ্গে ছিল মেয়ে, ভাতিজি ও ভাতিজি জামাই। সবাই যাচ্ছিলেন সিলেটে, সেখানে নিজের চিকিৎসা করাবেন ইউসুফ আলী। চার বছরের অসুস্থতা থেকে এবার মুক্তি মিলবে- এমন আশা করছিলেন ইউসুফ আলী, কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি; সৃড়কেই শেষ হয়ে গেছে তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। 

সোমবার (৪ মে) দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছাতক উপজেলার জালালপুর এলাকায় পৌঁছানোর পর ঘটে দুর্ঘটনা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জগামী রিফাত পরিবহনের একটি বাস হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সবকিছু।

ঘটনাস্থলেই মারা যান ইউসুফ আলী ও সিএনজি চালক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে একে একে মারা যান তার মেয়ে কেয়া আক্তার (১৫), ভাতিজি নিলুফা আক্তার (৩৫) এবং ভাতিজি জামাই শাহাব উদ্দিন (৩৯)। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করছিল। চার বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন ইউসুফ আলী। অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। রোববার রাতে তার অবস্থার অবনতি হলে প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে তাকে সিলেটে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যাত্রা পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর পথ।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে ইউসুফ আলীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তবে তার সঙ্গে যাওয়া বাকি তিনজনের মরদেহ তখনো গ্রামে পৌঁছেনি। একের পর এক মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় শোকে স্তব্ধ পরিবার।

নিহত ইউসুফ আলীর বৃদ্ধা মা জাবেদা খাতুনের কান্না যেন থামছেই না। ভাঙা কণ্ঠে বললেন, ‘আমার ছেলেটা ৪টা বছর ধইরা অসুস্থ। ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, ছেলে আমার লাশ হইয়া ফিইরা আইলো।’

এদিকে একসঙ্গে মেয়ে ও জামাই হারিয়ে দিশাহারা ইউসুফ আলীর ভাইয়ের স্ত্রী স্বপ্না বেগম। তার চোখেমুখে এখন পাঁচ নাতির অন্ধকার ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে-জামাই একলগে মইরা গেল, আমি এখন ৫ জন নাতি নিয়া কই যাইমু?’

ইউসুফ আলীর শ্যালিকা মমতাজ বেগম বলেন, ‘টাকা না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। শেষমেশ মানুষজন চাঁদা তুলে পাঠাইল, কিন্তু সেই পথেই সবাই শেষ হইয়া গেল।’

প্রতিবেশী মো. সেবুল বলেন, ‘খুবই দরিদ্র পরিবার আছিল। সবাই মিলে সাহায্য কইরা সিলেট পাঠাইছিলাম। ভাবি নাই এভাবে লাশ হয়ে ফিরবো।’

প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, অভাবই ছিল এই পরিবারের সবচেয়ে বড় শত্রু। সময়মতো চিকিৎসা হলে হয়তো এই যাত্রা লাগতো না। একটি দুর্ঘটনায় নিভে গেলো পাঁচটি প্রাণ। আর পেছনে রয়ে গেল ভাঙা একটি পরিবার, অনিশ্চিত কয়েকটি জীবন।

দুর্ঘটনার বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, সিএনজি চালকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে।