শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:৪৮ পিএম, ২০২৬-০৫-০৫
চট্টগ্রামের আকাশে মেঘ জমলেই নগরবাসীর মনে জেগে ওঠে এক চেনা শঙ্কা। এবার বৈশাখের বৃষ্টিতেও নগরবাসীর সেই শঙ্কা সত্যি হয়েছে। অল্প বৃষ্টিতেই ডুবেছে নগরের নিচু এলাকা। নগর ডুবলেই ক্ষতিগ্রস্ত হন বাসিন্দারা। নষ্ট হয় ব্যবসায়ীদের পণ্য। সড়ক নষ্ট হওয়ায় ক্ষতির শিকার হয় খোদ সিটি করপোরেশনও। এবারের জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি।
তবে এবারের জলাবদ্ধতা অন্যবারের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন আলোচনায় ছিল। এবারের দুর্ভোগের কথা জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামবাসীর দুর্দশার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে জরুরিভিত্তিতে চট্টগ্রাম পাঠিয়েছেন। তিনি এসেই চট্টগ্রামবাসীর ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরী পানিতে ডুবে যাওয়ার যে খবর ছড়িয়েছে, তার অনেকটাই ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক। ২০২৪ সালের ছবি ব্যবহার করেও অপপ্রচার চালানো হয়েছে।’
তার এই মন্তব্যে চট্টগ্রামবাসী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা মন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন।
পরে প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দায়ী করেন।
মন্ত্রী সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিমকে সরকারবিরোধী বলেও আখ্যা দেন, যা তিনি সরাসরি নাকচ করেন।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের প্রতিটি বিষয়ে তিনি খবর রাখছেন। সেনাবাহিনী খালের কাজ করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় কিছু এলাকার পানি নিষ্কাশন হতে দেরি হয়েছে। সেই বাঁধগুলো কেটে দেওয়ার জন্য তাদের বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব মুজিবুল হক শাকুর খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামবাসী কখনোই মিথ্যা কথা বলে না। জলাবদ্ধতা হয়েছে এটা সত্য। তা নিরসনে চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদত হোসেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তরিক বলে আমার মনে হয়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী হাস্যকর একটি মন্তব্য করেছেন। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পরদিন মন্ত্রী নিজে এসে সড়কে পানি দেখেছেন। সমস্যাকে উপেক্ষা করলে সমাধান আসবে না। বরং গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে এবং বিভিন্ন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে দুই দিনের জলাবদ্ধতায় আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পানিতে তলিয়ে কেউ হারিয়েছেন সারাজীবনের পুঁজি, কেউ মালামাল হারিয়ে দিশেহারা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানিতে নষ্ট হয়েছে শত শত দোকানের পণ্য। শুধু প্রবর্তক মোড় ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়কেই ক্ষতির পরিমাণ হবে ৫ কোটি টাকা। এখানে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ এবং সার্জিক্যাল পণ্য ভিজে নষ্ট হয়েছে। এছাড়া মুরাদপুর, চকবাজার, বহদ্দারহাটসহ অন্যান্য এলাকার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নগরীর প্রবর্তক মোড়ের একটি খাবারের দোকানের মালিক রবিউল জানান, জীবনের সব পুঁজি দিয়ে দুই বছর আগে চালু করা দোকান দুদিনের জলাবদ্ধতায় পানিতে ভেসে গেছে।
একই অবস্থা মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট, চকবাজার কাতালগঞ্জ পূর্ব চাঁন্দগাঁও এলাকার ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের। পানি নামার পর স্পষ্ট হয় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
মুরাদপুর হোটেল জামান রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে তাদের একদিনের রান্না করা খাবার ফেলে দিতে হয়েছে। এতে তাদের সেদিন তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও চট্টগ্রামের সভাপতি ছালেহ আহমদ সোলেমান খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামে দুইদিনের জলাবদ্ধতায় ব্যবসায়ীদের অনেক লোকসান হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের ওষুধের দোকানে কোটি কোটি টাকার ওষুধ ভিজে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের নিচু এলাকার রেস্টুরেন্টসমূহের রান্না করা খাবার পানিতে ভিজে যায়, যা তারা আর বিক্রি করতে পারেননি। শত শত রেস্টুরেন্ট, ওষুধের দোকান, মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করে অন্তত ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম শহরের বেশকিছু সড়কের ছাল-বাকল উঠে গেছে। ওইসব সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক নালার প্রতিরক্ষা দেয়াল ভেঙে গেছে। কিছু নির্মাণাধীন সড়কেরও ক্ষতি হয়েছে। এতে অন্তত ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টি থামার পরপর এসব সড়ক সংস্কারের কাজে হাত দিতে হবে। কারণ নগরের সড়কে যানবাহনের চলাচল উপযোগী রাখতে সিটি করপোরেশন সব সময় চেষ্টা করে।
তবে সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করছে সিডিএর মাধ্যমে সেনাবাহিনী। অপরদিকে স্যুয়ারেজ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। নগরজীবনে বৃষ্টির কারণে যে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তা ওই দুই সংস্থার কাজের কারণে হচ্ছে। আমি এজন্য তাদের দোষ দিই না। কারণ উন্নয়ন কাজ করতে হলে কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সমালোচনা করে সিটি করপোরেশনের। ওইসব প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও আমি নিজে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের পাশে যাচ্ছি। যেখানে পানি আটকে থাকছে সেখানে বাধা অপসারণ করছি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ১৫ মের মধ্যে নগরের বিভিন্ন খালে থাকা ৩০টি বাঁধ অপসারণ করা হলে সড়কে আর পানি থাকবে না। তবে প্রবর্তক মোড় এবং কাতালগঞ্জ নিচু এলাকা। ওইসব এলাকার পানি অপসারণে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞের মত
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের অন্যতম নেতা প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, সিটি গভর্নমেন্ট বাস্তবায়ন ছাড়া চট্টগ্রাম শহরের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ এখানে একেকটি সংস্থা একেকভাবে কাজ করে। একেক সংস্থার মন্ত্রণালয় আলাদা। তাই কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে চাইলেও পারে না।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা বহুদিনের। সম্প্রতি বিপুল অর্থ ব্যয় করে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও সমাধান আসেনি। কারণ, সমস্যাটিকে সমন্বিতভাবে না দেখে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে খণ্ডিতভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড- এই তিন সংস্থার অধীনে চারটি বড় প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। এগুলো একক পরিকল্পনার অংশ না হয়ে আলাদা কাঠামোয় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে একটি প্রকল্পের কাজ অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত নয়।
প্রকৌশলী দেলোয়ার জানান, জলাবদ্ধতার জন্য খাল, নালা, জলাধার, নদী, জোয়ার-ভাটা- সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। সেখানে যদি এক সংস্থা খাল খনন করে, আরেক সংস্থা ড্রেন তৈরি করে, কিন্তু তাদের মধ্যে যদি কার্যকর সমন্বয় না থাকে তাহলে পানি নিষ্কাশনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। বর্তমানে তাই ঘটছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের গোড়ায় কিছু গলদ ছিল। নগরের চিহ্নিত ৭৪টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি খাল একটি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ কোথাও না কোথাও আটকে যাচ্ছে। একইভাবে ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় প্রস্তাবিত রিটেনশন পন্ড বা জলাধারগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকলে পানি উপচে পড়বে। কারণ, একদিকে খাল খনন করা হচ্ছে, অন্যদিকে জলাধার ও নিচু জমি ভরাট করা হচ্ছে।
এবার দেখা গেছে, খালের সংস্কারকাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময়মতো অপসারণ না করায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বর্জ্যব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে খাল রক্ষণাবেক্ষণে। সৌজন্যে খবরের কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত