বিপজ্জনক ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক

Passenger Voice    |    ১১:৩৯ এএম, ২০২৬-০৫-০৪


বিপজ্জনক ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। প্রতিদিন এই পথে হাজার হাজার বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে। এক সময় ‘টিউমার সড়ক’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা মানিকগঞ্জ অংশের বড় একটি অংশ সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে। তবে সেখানে এখন দেখা দিয়েছে নতুন এক সংকট। দীর্ঘ সড়কজুড়ে নেই কোনো রোড মার্কিং। এতে বিশেষ করে রাতে ও বৃষ্টির সময় চালকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের বারোবাড়িয়া থেকে আরিচা পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কিলোমিটার সড়ক দীর্ঘদিন ধরে পিচ উঠে গিয়ে উঁচু-নিচু হয়ে পড়ে। এতে অন্তত ১০টি স্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছিল।

এই পরিস্থিতিকে সামনে এনে গত বছরের ৬ এপ্রিল দেশীয় গণমাধ্যম খবরের কাগজে গলার কাঁটা ‘টিউমার সড়ক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর পর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সওজ বিভাগ পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রামের (পিএমপি)  আওতায় গোলড়া থেকে উথলী পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার শুরু করে। সেখানে ডাবল বিটুমিনাস সারফেস ট্রিটমেন্ট (ডিবিএসটি) পদ্ধতিতে কাজ চলে।

প্রকল্প অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সংস্কার কাজ যেসব এলাকায় শেষ হয়েছে, সেখানে এখনো রোড মার্কিং না থাকায় নতুন করে সমস্যার সৃষ্টির কথা স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মানিকগঞ্জ বাস টার্মিনাল থেকে আরিচা ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়কের বেশির ভাগ অংশে কোনো সাদা বা হলুদ লেন মার্কিং নেই। কোথাও কোথাও পুরোনো মার্কিংয়ের ক্ষীণ চিহ্ন থাকলেও তা কার্যকর নয়। এ ধরনের অংশের দৈর্ঘ্য তিন থেকে চার কিলোমিটারের বেশি নয়।

দিনের বেলায় চালকরা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে গাড়ি চালাতে পারলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির হেডলাইটে লেন বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরা, বানিয়াজুরী, জোকা, পুখুরিয়া ও বরংগাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতে ওভারটেকিংয়ের সময় প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা গেছে। অনেক চালক বাধ্য হয়ে রাস্তার মাঝখান বা একেবারে পাশে গাড়ি চালান।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, মহাসড়কে নিরাপদ যান চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট লেন ও রোড মার্কিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি যানবাহনকে নির্ধারিত লেনে চলতে হয় এবং ওভারটেকিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সড়কের চিহ্ন ও সংকেত মানা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই সড়কে মার্কিং না থাকায় আইন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে চালকরা ইচ্ছামতো লেন পরিবর্তন করছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

চালকদের অভিযোগও একই রকম। পাটুরিয়া থেকে ঢাকাগামী সেলফি বাসের চালক মো. রহমান বলেন, ‘দিনে কোনোভাবে গাড়ি চালানো যায়, কিন্তু রাতে সমস্যা বেশি হয়। লেন বোঝা যায় না, সামনে থেকে গাড়ি এলে হেডলাইটের আলোয় চোখ ঝলসে যায়, তখন রাস্তার মাঝখান কোথায়, সেটা বুঝতে পারি না।

মহাসড়কে নিয়মিত চলাচল করা ট্রাকচালক আকবর আলী বলেন, ‘আমরা ভারী যান চালাই। রোড মার্কিং না থাকলে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সামান্য ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শীতকালে কুয়াশার কারণে কিছুই দেখা যেত না, তার ওপর সংস্কারের পরও রোড মার্কিং না থাকায় সমস্যা আরও বেড়েছে।’

মোটরসাইকেলচালক আবিদ হাসান বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকি আমরা। বড় গাড়ি হঠাৎ করেই ওভারটেক করে। রাস্তায় কোনো দাগ না থাকায় বোঝা যায় না কোনটা নিরাপদ লেন।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোড মার্কিং না থাকায় গত কয়েক মাসে ছোট-বড় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া ওভারটেকিং এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

মানিকগঞ্জ সওজ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবদুল কাদের জিলানী বলেন, ‘সংস্কার কাজ শেষ পর্যায়ে। ডিবিএসটি করার পর সড়ক পুরোপুরি মসৃণ না হলে রোড মার্কিং করা যাবে না।’ তিনি জানান, পিরিওডিক মেইনটেন্যান্সের আওতায় আগে সড়কের কাঠামোগত উন্নয়ন ৮০ শতাংশ সম্পন্ন করা হয়েছে। আবহাওয়ার কারণে বাকি কাজে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, তবে দ্রুত সময়ের মধ্যেই পুরো সড়ক সংস্কার শেষে রোড মার্কিং সম্পন্ন করা হবে।