সুপ্রিম কোর্ট সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞার ৪ মাস

Passenger Voice    |    ০১:৫৩ পিএম, ২০২৬-০৫-০৩


সুপ্রিম কোর্ট সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞার ৪ মাস

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ৭ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সেই অবস্থা এখনও বহাল আছে। সুপ্রিম কোর্টের এক নম্বর আদালত কক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চেও গণমাধ্যমের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম যখন সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার হচ্ছে, সারা বিশ্ব তা দেখছে, তখন আসে এই নিষেধাজ্ঞা। এর মধ্যে আজ ৩ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে গতকাল শনিবার কথা হয় আইন, বিচার ও মানবাধিকারবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) ও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে।

প্রধান বিচারপতির এজলাসসহ সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের এজলাস কক্ষে উপস্থিত থেকে মামলার বিভিন্ন পক্ষের সওয়াল-জবাব প্রত্যক্ষ করে অব্যাহতভাবে সংবাদ পরিবেশন করে আসছিলেন আইনবিষয়ক সাংবাদিকরা। তবে গত ৪ জানুয়ারি নতুন প্রধান বিচারপতি এজলাসে বসার ২ দিন পর ৭ জানুয়ারি গণমাধ্যমের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। হঠাৎ কী কারণে এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো, তা সাংবাদিকদের জানানোর সৌজন্যটুকু পর্যন্ত দেখায়নি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তর।

এ পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি হাসান জাবেদ গতকাল দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত ৭ জানুয়ারি থেকে আমরা আইনবিষয়ক সাংবাদিকরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাসে সংবাদ সংগ্রহের জন্য ঢুকতে পারছি না। বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য  ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন দিয়েছি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য আছে কি না, তা জানতে ফোরামের পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছি। তিনি জানান যে, প্রধান বিচারপতি নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। নির্দেশ আগের মতোই আছে। কথা বলার জন্য আমরা ফোরাম থেকে প্রধান বিচারপতির সাক্ষাতের অনুমতি চাই। সেই অনুমতিও মেলেনি।

গণমাধ্যমকে প্রধান বিচারপতির এজলাসে ঢোকার ক্ষেত্রে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমরা আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতিকেও অবহিত করেছি। উনারা আমাদেরকে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা যাতে উঠে যায় সেই চেষ্টা তারা করছেন।

ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা এ বিষয়ে আপিল বিভাগের দুইজন বিচারপতির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে কথা বলেছি। উনারা বলেছেন, অপেক্ষা করেন, হয়তো ইতিবাচক কিছু হবে। এরপর ১০-১২ দিন হয়ে গেছে। কোনো অগ্রগতি নেই।’

হাসান জাবেদ বলেন, ‘সংবাদ সংগ্রহ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সংবাদ সংগ্রহ করতে না দেওয়া সমীচীন হচ্ছে কি না, আশাকরি প্রধান বিচারপতি সেটি বিবেচনা করে দেখবেন। গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তাই সংবাদ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা যেন তুলে নেওয়া হয়, সেই অনুরোধ করছি।’

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী গতকাল শনিবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো আপডেট নেই।’ ‘তার মানে আগে যেমন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তেমনই আছে’–প্রশ্ন করলে জবাবে তিনি বলেন, ‘সেম সেম…’ (একই আছে)। 

সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে এ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও। তিনি বলেছেন, স্বাধীন গণমাধ্যম সবসময় নির্বিঘ্নে কাজ করবে এ ব্যাপারে আমি সবার সঙ্গে একমত। সাংবাদিক হিসাবে সংবাদ সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি আমি যথাস্থানে উপস্থাপন করেছি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুবও সম্প্রতি আদালতকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সেনসিটিভ মামলাগুলোর বিচার হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে। সেই বিচারও আমরা লাইভে প্রচার হতে দেখেছি। ফলে এজলাসের ভেতরে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের যাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা কোথায় সেটি আমাদের কাছেও বোধগম্য নয়।

এ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন সাংবাদিক নেতারাও। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ করব তিনি যেন এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। আশা করছি তিনি সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা না দিয়ে সহায়তা করবেন।

সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানিতে সাংবাদিকদের নির্বিঘ্ন প্রবেশাধিকার চেয়ে গত ২৯ জানুয়ারি দ্বিতীয় চিঠিটি দেয় এলআরএফ। এতে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে মামলা শুনানিতে সাংবাদিকদের নির্বিঘ্নে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

এলআরএফ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি বরাবর এই চিঠি দেয়। এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে ল রিপোর্টার্স ফোরামের পক্ষ থেকে আবেদন দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের মামলার শুনানিতে সাংবাদিকদের নির্বিঘ্নে প্রবেশের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়।

এলআরএফের চিঠিতে বলা হয়, সাংবিধানিক, জনস্বার্থ ও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলা সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি ও নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। সংবিধানের রক্ষক হিসেবে নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষাসংক্রান্ত মামলায় সর্বোচ্চ আদালত অভিমত, পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। জনগুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ এসব সিদ্ধান্ত ও তথ্য সম্পর্কে বিচার প্রার্থীসহ সাধারণ মানুষের জানার আগ্রহ রয়েছে।

চিঠিতে ল রিপোর্টার্স ফোরাম বলেছে, আদালত সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিট (সংবাদ ক্ষেত্র)। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য গণমাধ্যম কর্মীরা সুপ্রিম কোর্টে সংবাদ সংগ্রহের জন্য আসেন। আদালতে উপস্থিত থেকে জনগণকে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য জানানোর ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা দায়বদ্ধ।

চিঠিতে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারা ও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে উন্মুক্ত আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রুলসের আদেশ ১০–এ উন্মুক্ত আদালতের রায় ও আদেশ প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া প্রকাশ্য আদালতে রায় ও আদেশ প্রদানে অধস্তন আদালতের প্রতি ২০২১ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ও পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ও পঞ্চদশ সংশোধনী, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার সংবাদ প্রকাশ্য আদালতে উপস্থিত থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা সংগ্রহ করেছেন, যা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলছিল।

চিঠিতে বলা হয়, ৭ জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগসহ হাইকোর্ট বিভাগের কোনো কোনো বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে মামলার শুনানি ও সিদ্ধান্তের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি।