সেতু-সড়কের টোল:প্রযুক্তির ভিন্নতায় মিলছে না সুবিধা

Passenger Voice    |    ১১:২৩ এএম, ২০২৬-০৫-০৩


সেতু-সড়কের টোল:প্রযুক্তির ভিন্নতায় মিলছে না সুবিধা

দেশের কিছু সড়ক ও সেতুতে টোল আদায়ে আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাটির সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সরকারি সংস্থা, অপারেটর ও সফটওয়্যার সংশ্লিষ্ট থাকায় গাড়ির এক নিবন্ধন দিয়ে সব সেতুর টোল বুথে সুবিধা নেওয়া যাচ্ছে না। এতে ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সময়ের দিক থেকে সাশ্রয়ী হলেও আধুনিক সেবাটির প্রতি আগ্রহও আশানুরূপ বাড়ছে না।

দেশে প্রধানত তিনটি সংস্থা— সেতু বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ইটিসি প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা করছে। পাশাপাশি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও রয়েছে পৃথক ইটিসি ব্যবস্থা। এ সেবার জন্য নির্দিষ্ট মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। গাড়ির নাম্বার প্লেটে থাকতে হয় রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি আইডেনটিফিকেশন (আরএফআইডি) ট্যাগ। সরকারি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব বা ঠিকাদারনির্ভর ভিন্ন ভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করায় ইটিসি টোলব্যবস্থায় একাধিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। ব্যবহারকারীদের প্রতিটি ব্যবস্থায় আলাদাভাবে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। একটিতে নিবন্ধন করে অন্য ইটিসিতে টোল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সেতু বিভাগের সেতুতে তিন ব্যবস্থা
সেতু বিভাগের আওতাধীন চারটি স্থাপনায় ইটিসি চালু রয়েছে—যমুনা, পদ্মা ও মুক্তারপুর সেতু এবং কর্ণফুলী টানেল। এসব স্থাপনায় তিনটি ভিন্ন অপারেটর তিন ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে টোল আদায় করছে। সেতু বিভাগের সব সেতুতেই ইটিসি চালু করতে হলে আরএফআইডি ট্যাগ থাকতে হবে গাড়ির নাম্বার প্লেটে। তবে যমুনা সেতু ও মুক্তারপুর সেতুর ইটিসি ব্যবস্থা এক ধরনের।

পদ্মা সেতুর টোল বুথে নিবন্ধনের জন্য ব্যবহারকারীকে বিকাশ বা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যুক্ত হতে হয়। এরপর টোল প্লাজায় থাকা নিবন্ধন বুথে গিয়ে আরএফআইডি ট্যাগ যাচাই করে গাড়ি সিস্টেমে যুক্ত করা হয়। এই নিবন্ধনব্যবস্থাটি অন্য দুই সেতুতে কার্যকর নয়।

আলাদা ব্যবস্থা কর্ণফুলী টানেলেও সেতু বিভাগের আওতাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে রয়েছে ডিভাইসভিত্তিক টোলব্যবস্থা। এখানকার ইটিসির পদ্ধতি আলাদা। এখানে গাড়িতে একটি বিশেষ ডিভাইস (যন্ত্র) বসাতে হয়, যার ভেতরে রিচার্জযোগ্য কার্ড থাকে। টোল প্লাজা অতিক্রমের সময় সেন্সরের মাধ্যমে কার্ড থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোলের টাকা কেটে নেওয়া হয়। এই ডিভাইস অন্য কোথাও ব্যবহার করা যায় না।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বাসেক) প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, ‘আমাদের এক এক সেতুতে আলাদা অপারেটর। কারণ অনেক আগে নেওয়া বলে। তবে যমুনা ও মুক্তারপুর সেতুর ইটিসি ব্যবস্থা এক।’

সওজে এক নিবন্ধনে সব সেতু ও সড়ক
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় ৭১টি টোল প্লাজার মধ্যে ১৫টিতে নিজস্ব সফটওয়্যারের ইটিসি চালু রয়েছে। এর মধ্যে আছে মেঘনা, গোমতী, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা, শহীদ ময়েজ উদ্দিন, ভৈরব, চরসিন্ধুর, মধুমতী, তৃতীয় কর্ণফুলী, রূপসা, লালন শাহ, হজরত শাহপরান, পায়রা, অষ্টম বাংলাদেশ সেতু এবং হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়ক।

সওজের ক্ষেত্রে ইটিসিতে একবার নিবন্ধন করলে তাদের আওতায় থাকা সব সেতু ও সড়কে টোল দিতে ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি যানবাহন এতে নিবন্ধিত। তবে সওজের ইটিসির নিবন্ধন সেতু বিভাগ বা সিটি করপোরেশনের স্থাপনায় কার্যকর নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বলেন, ‘সওজের সব সেতুতেই একই ইটিসি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। শুধু ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তবে এ ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ও বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হচ্ছে। বিকাশ, নগদসহ জনপ্রিয় এমএফএস সেবাগুলোর পাশাপাশি ৯টি ব্যাংকের সঙ্গে ইতিমধ্যে চুক্তি হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই উদ্যোগে যুক্ত হলে সব টোল প্লাজায় অভিন্ন ফরম্যাটে টোল আদায় সম্ভব হবে।’

সিটি করপোরেশনের ফ্লাইওভারে আলাদা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) পরিচালিত গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে (মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার) ইটিসি সুবিধা ব্যবহার করতে হলে নির্ধারিত সফটওয়্যার ‘MMHF Toll’ অথবা তাদের অনুমোদিত মোবাইল ব্যাংকিং ওয়ালেটে নিবন্ধন করতে হয়। এই ফ্লাইওভারের ইটিসি ব্যবস্থা অন্য কোনো সেতু বা সড়কে কাজ করে না।

ব্যবহারকারীর ভোগান্তি
বিচ্ছিন্নব্যবস্থার কারণে একই গাড়ির জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল দিতে একাধিক প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। এ কারণে কোনো অপারেটের ইটিসিতে নিবন্ধিত থাকা সত্ত্বেও অন্য জায়গায় টোল দিতে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

শ্যামলী পরিবহনের বাসচালক জুয়েল রানা বলেন, ‘দেখা গেল গাড়িতে যমুনা সেতুর ইটিসি আছে, কিন্তু মেঘনা সেতুতে তা কাজ করে না। এতে সময় নষ্ট হয়, আলাদা করে আবার টাকা রাখতে হয়।’

শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভংকর ঘোষ রাকেশ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সব টোলকে একক প্ল্যাটফর্মে এনে একটি অ্যাকাউন্টে সেবা চালুর পাশাপাশি ব্যাংক বন্ধের সময় ব্যবহারের জন্য ক্রেডিট সুবিধা চালু থাকতে হবে।’

রাজধানীর মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেট কারচালক মাহবুব হাসান বলেন, ‘গাড়ি নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয়। আমাদের গাড়িতে পদ্মা সেতুর ইটিসি নিবন্ধন করা আছে। কিন্তু অন্য সেতুতে তা কাজ করে না। সুবিধার জন্য ডিজিটাল সিস্টেম চালু হয়েছে ভালো কথা। কিন্তু এক নিবন্ধন সব জায়গায় কাজ না করলে আমাদের ভোগান্তি কমবে না।’

আগ্রহ না বাড়ার শঙ্কা
সময় ও অর্থের সাশ্রয় এবং স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার প্রত্যাশা থেকে ইটিসি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, অপারেটরের ভিন্নতার কারণে সব স্থাপনায় এক নিবন্ধন ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে ব্যবহারকারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে ডিজিটাল টোলব্যবস্থার লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘দেশে ইটিসি ব্যবস্থায় সমন্বয় ও নীতিগত ঐক্যের ঘাটতি বড় সমস্যা। ফলে ব্যবহারকারীরা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এবং সামগ্রিকভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত একটি অভিন্ন ও সর্বজনীন ব্যবস্থা চালু করা না হলে পুরো ব্যবস্থা তৃতীয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তখন নতুন নতুন ডিভাইস, অতিরিক্ত খরচ ও জটিলতার মাধ্যমে জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়বে। যারা এখন বিশৃঙ্খলভাবে ইটিসি চালু করছে, তারাও জনগণের এই ভোগান্তির দায় এড়াতে পারে না।’

অবশেষে একক ব্যবস্থার পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জনভোগান্তির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সব সেতু ও সড়কের ইটিসি এক প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা করছে। এতে একবার নিবন্ধন করলেই সব স্থাপনায় টোল দেওয়া যাবে।

সরকারের সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, ‘অভিন্ন ইটিসি করার জন্য আইসিটি মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। সারা দেশের জন্য একটাই সমাধান হতে হবে। এটা আইসিটি মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয়ভাবে এটার উদ্যোগ নিয়েছে।’