শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:২৪ এএম, ২০২৬-০৪-২৮
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় সবচেয়ে লাভজনক ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। বিশেষ করে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে ব্যাংকটির বিভিন্ন আর্থিক সূচকে (লাভ, বিনিয়োগ, আয়, গ্রাহকভিত্তি ইত্যাদি) ধারাবাহিক ইতিবাচক সাফল্য লক্ষ্য করা যায়। তবে ২০২৪ সালের পরবর্তী সময় বিশেষ করে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থায় আকস্মিক ধস নামে। ইসলামী ব্যাংকের বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানা গেছে।
২০১৭ সালের পর থেকে ইসলামী ব্যাংক ক্রমান্বয়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে এবং দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করে। এই সময়ে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় এবং কমিশন আয় বাড়ে। শাখার বিস্তৃতি ঘটে এবং আমানতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়। নিয়মিত মুনাফা অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। সব মিলিয়ে ব্যাংকটি একটি স্থিতিশীল ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের ধস নামে। ২০২৪ সালে ব্যাংকের নিট মুনাফা ৮৩ শতাংশ কমে মাত্র ১০৮ কোটি টাকায় নেমে আসে, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৬৩৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মুনাফা আরও ৮১ শতাংশ কমে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার বড় অবনতি ঘটেছে।
ইসলামী ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকের আমানত ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে যাত্রা শুরুর পর ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৩ বছরে ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৬৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৭ বছরে ব্যাংকটির আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২৫ শতাংশ। এদিকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। তবে এই অর্থের অধিকাংশই একটি রাজনৈতিক দলের নির্দেশে তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের নির্বাচনি প্রচারে ব্যয় হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালে রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপক অগ্রগতি হয়। এ সময় ইসলামী ব্যাংক দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এককভাবে আহরণ করে কিন্তু বর্তমানে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হয়ে তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
একই সময়ে ইসলামী ব্যাংক আমদানি ও রপ্তানিকারকদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছিল। পর্যাপ্ত ডলারের জোগান থাকায় বৈদেশিক সরবরাহকারীদের আস্থায়ও এক নম্বরে ছিল ইসলামী ব্যাংক। এমনকি সরকারি ব্যাংকের চেয়েও ইসলামী ব্যাংক ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষার্ধ থেকে অদক্ষ ম্যানেজমেন্ট ও বোর্ড এ ব্যবসায় ধস নামিয়ে দেয়। ২০১৬ সালে যেখানে ব্যাংকটির মাধ্যমে ৩৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য ওস বা আমদানি করা হয়, যা ২০২৩ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র সাত বছরের মধ্যে ব্যাংকটির আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা হয়। ২০২৫ সালে তা আবার কমে ৫৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। ২০১৬ সালে রপ্তানি হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার, যা ২০২৩ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৪২ শতাংশ বেড়ে হয় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এর পরের দুই বছরেই উল্লেখযোগ্য হারে রপ্তানি কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সময়ে ব্যাংকের মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এই খাতে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকে পরিণত হয় ইসলামী ব্যাংক। ২০২৪-এর শেষার্ধ থেকে অদক্ষ বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে ব্যাংক লোকসানে চলে গেছে। প্রকাশ্যে মুনাফায় থাকা ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ ইসলামী ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির ‘গুপ্ত’ লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
যেকোনো ব্যাংকের আর্থিক চিত্র নির্ধারিত হয় ব্যাংকটির মুনাফা দিয়ে। ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটি মুনাফায় ছিল শীর্ষে এবং প্রতিবছর তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। মাঝে করোনার দুটি বছর বাদে প্রতিবছরই সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে ইসলামী ব্যাংক।
ব্যাংকটির একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত অর্জিত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ সাল শেষে মুনাফা দেখানো হয়েছে, যা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নয়। এদিকে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেও মুনাফা দেখিয়েছে ব্যাংকটি। সব ব্যাংক ২০২৫ সালের মুনাফা ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক মুনাফা ঘোষণা করেনি।
এর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের আইটি বিভাগের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক হয়তো তার আর্থিক বিবরণীতে কিছু মুনাফা দেখাবে কিন্তু বাস্তবে বিশাল অঙ্কের লোকসান রয়েছে ব্যাংকটিতে, যা বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
তিনি আরও বলেন, সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকালে এ রকম তথ্য গোপনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও সহায়তা পাওয়া যেত। এখন তা না পাওয়াতে মুনাফা ঘোষণা করতে পারছে না ব্যাংকটি। এমন অবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রেও ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভালো প্রবৃদ্ধি ছিল। কিন্তু এর পরের দুই বছরে ব্যাংকটি তা আর ধরে রাখতে পারেনি।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগ সব সময় ৪ শতাংশের নিচে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির ম্যানেজমেন্ট ও বোর্ড বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিনিয়োগ জোরপূর্বক খেলাপি করে। এ কারণে তা ৪৮ শতাংশে পৌঁছায়। অতীতে কখনো ইসলামী ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ না হলেও ২০২৪ সাল থেকে বিরাট অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ে, যা বর্তমানে টাকার অঙ্কে ৭৮ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এই প্রভিশন ঘাটতি পূরণ বা সংরক্ষণ করতে হলে ব্যাংকের সময় লাগবে মোট ১৪০ বছর যা কার্যত সম্ভব নয়।
সার্বিক বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, বিগত ১৮ মাসে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অদক্ষ বোর্ড ও ম্যানেজমেন্ট মিলে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ব্যাংকটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে দেশের অর্থনীতির প্রাণ খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি অস্তিত্বসংকটে পড়বে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের ব্যাংক খাত ও জাতীয় অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে কার্যকর নীতি, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত