আমদানি-রপ্তানিতে ধাক্কা,কমছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আয়

Passenger Voice    |    ০৩:৩২ পিএম, ২০২৬-০৪-২৭


আমদানি-রপ্তানিতে ধাক্কা,কমছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আয়

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশে জ্বালানিসংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ে, যা চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রবৃদ্ধি অর্জনে মারাত্নক প্রভাব পড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। 

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস প্রায় ৫৮ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। যদিও সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, তবে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গত (২০২৪-২৫) অর্থ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে আদায় হয়েছিল ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, আগের অর্থ বছরের ৯ মাস থেকে চলতি অর্থ বছরের ৯ মাসে ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কম আদায় হয়েছে। 

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মার্চ মাসে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি, অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। আদায়ের হার লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৩৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম। এভাবে প্রত্যেক মাসে মাসিক রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি কাস্টমস। 

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তারা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইরানের হামলা শুরু করেছিল। পাল্টা জবাবে পুরো মধ্যেপ্রচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল যুদ্ধ। এ কারণে রপ্তানি খাতেও প্রভাব পড়েছে। পোশাক রপ্তানিতে রাজস্ব আদায়ের একটি বড় অংশ আয় হয়। বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় নতুন অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। যা গত মার্চের শুরু থেকে এখনও চলমান রয়েছে।

তবে কিছু উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তবুও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বা স্থগিত রেখেছেন। এতে কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ও কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের রপ্তানি কমায় রাজস্ব আদায়ের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। 

এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি করা পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের বাজারের জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়েছে সম্প্রতি। এর প্রভাব অন্যান্য খাতের সঙ্গে শিল্পকারখানায় পড়েছে। 

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রচ্যে যুদ্ধ শুরু, দেশে সরকার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা সব কিছুর প্রভাব রাজস্ব আদায়ের ওপর পড়েছে। দেশে জ্বালানিসংকটেরও প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীরা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে না পারলে সরকারকে রাজস্ব কীভাবে দিবে, ব্যবসা পরিচালনা করেই তো দিতে হবে। কলকারখানা চালু রাখা ও আমদানি রপ্তানির ধারা সুন্দর ভাবে বজায় থাকলে রাজস্ব বেশি আদায় সম্ভব হবে।  

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আবারও গতি পাবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। কারণ এ যদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুরে পড়েছে। 

বিজিএমইএ পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। উৎপাদন খরচের সঙ্গে আয়ের হিসাব মিলছে না। প্রত্যেক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেখানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দায় সেখানে রাজস্ব বাড়ানোর কল্পনা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চাপ দেওয়া শুরু করেছে রাজস্ব বৃদ্ধির। আমদানি-রপ্তানি আরও সহজ ও সচল না করলে ব্যবসায়ীরা রাজস্ব দিবেন কীভাবে?