শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:২০ পিএম, ২০২৬-০৪-২৭
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-বরিশালসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলোতে লঞ্চ চলাচল চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ জন্য পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রীখরা এবং সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের তীব্রসংকট ও মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করেন লঞ্চসংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, অনেক রুটে নিয়মিত লঞ্চ সার্ভিস চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে দেশের লজিস্টিকস খাতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সড়ক ও আকাশপথের পর এবার অভ্যন্তরীণ নৌপথেও পণ্য পরিবহন ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আমদানীকৃত কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তেল না পাওয়ায় অনেক লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ
বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চমালিকদের তথ্যমতে, তিন বছর আগেও ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে প্রতিদিন গড়ে ১৬টি লঞ্চ চলাচল করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমেছে ৪টিতে। পদ্মা সেতু চালুর পর লঞ্চগুলো যাত্রীখরায় ভুগছে। এবার সেই ব্যবসায়িক মন্দার সঙ্গে নতুন আপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের তীব্রসংকট।
ঢাকা-ভোলা রুটে চলাচলকারী গ্রিনলাইন ওয়াটার ভেসেলের জিএম আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রতিদিন একটি ওয়াটার বাস চালাতে ২ থেকে ৪ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। তেল না পাওয়ায় এখন অনেক সার্ভিস বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক আকতার হোসেন আকেদ বলেন, ‘আমাদের তিনটি লঞ্চে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২১ হাজার লিটার তেল লাগে। অথচ এখন পাওয়া যাচ্ছে ১২ থেকে ১৪ হাজার লিটার। তেলের অভাবে বাধ্য হয়ে একটি লঞ্চ বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।’
ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ
যাত্রী কমে যাওয়া এবং তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে সাধারণ মানুষের ওপর বেড়েছে ভাড়ার চাপ। ডেকে ৫০ টাকা এবং কেবিনে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও মালিকদের দাবি, এটি পূর্বনির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় মাত্র।
সুরভী নেভিগেশনের মালিক রিয়াজ উল কবির জানান, গত ৪ বছরে ২ দফায় জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টে সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী ডেকের ভাড়া ৪৬৩ টাকা, নন-এসি সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ১০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২ হাজার ২০০ টাকা। এসি সিঙ্গেল ১ হাজর ২০০ এবং ডাবল ২ হাজার ৪০০ টাকা। তবে লঞ্চের মানভেদে লাক্সারি ও ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। যাত্রী টানতে মালিকরা ডেক ভাড়ায় ১০-২০ শতাংশ ছাড় দিলেও খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বন্ধ হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রুট
নিজাম শিপিং লাইনসের স্বত্বাধিকারী নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘পদ্মা সেতুর পর লঞ্চ ব্যবসায় ধস নেমেছিল, তেলের সংকটে এখন তা কফিনে শেষ পেরেকের মতো বিধছে। ব্যবসা প্রায় বন্ধের উপক্রম।’
তিনি জানান, বরিশাল রুটে লঞ্চ কমে ৪টিতে নামলেও বরগুনা, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী রুটে যেখানে আগে ৬টি লঞ্চ চলত, সেখানে এখন চলছে মাত্র ১টি করে। বাগেরহাট, ভান্ডারিয়া ও কাউখালী রুটেও সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমেছে। প্রতিটি আপ-ডাউন ট্রিপে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের। ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানি লঞ্চ ডকইয়ার্ডে নোঙর করে রেখেছে, কেউ কেউ পুরোনো লঞ্চ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি শুরু করেছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জামান বাদল বলেন, ‘রেশনিং করা তেলে লঞ্চ চলতে পারে না, মাঝপথে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জ্বালানি সংকটে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০টি লঞ্চ বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন।’
বেড়েছে লাইটার জাহাজ ভাড়া
গত ২২ এপ্রিল ঢাকায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় লাইটার জাহাজের ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লাইটার জাহাজ মালিকদের ভাষ্যমতে, ভাড়া না বাড়িয়ে তাদের আর কোনো উপায় ছিল না।
লাইটার জাহাজ শেখ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাহাঙ্গীর জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি বন্দরের পোর্ট ইউজার রেট ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিনের বার্থিং রেট ২ হাজার টাকা এবং জাহাজ মেরামতের প্লেটের দাম দ্বিগুণ হয়ে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই চতুর্মুখী খরচ সামাল দিতেই ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে।
এর আগে বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো বা অফ-ডকগুলোতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অথচ গত জানুয়ারিতেই একবার ২০ শতাংশ চার্জ বাড়ানো হয়েছিল।
এর আগে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) অফ-ডকগুলোতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়িয়েছিল। যে কারণে বেড়ে গেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয়। অথচ গত জানুয়ারি মাসে ২০ শতাংশ চার্জ বাড়িয়েছিল বিকডা।
আন্তর্জাতিক রুটে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজ ভাড়া আগে থেকেই ২০ শতাংশ বাড়তি ছিল, এখন অভ্যন্তরীণ রুটেও সেই চাপ যুক্ত হলো।
পণ্য পরিবহনে ত্রাহি দশা
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহন ভাড়া ইতোমধ্যে আকাশচুম্বী। স্বাভাবিক সময়ের ২০-২২ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া বর্তমানে ৩৫ হাজার টাকায় ঠেকেছে।
ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহম্মদ জানান, বর্ধিত দাম দিয়েও সময়মতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হওয়ায় পরিবহনসংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয়ের এই উল্লম্ফন সরাসরি প্রভাব ফেলছে ভোগ্যপণ্যের বাজারে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস এবং চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন জানান, সবজি, ভোজ্যতেল, চিনি ও মসলার দাম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে এবং এর চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকে।
আকাশপথ ও রপ্তানিতে ধাক্কা
আকাশপথে কার্গো ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সবজি রপ্তানি মুখ থুপড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াক অ্যান্ড এসএ লিমিটেডের তথ্যমতে, আগে প্রতি কেজি সবজি পাঠাতে ৪৫০ টাকা খরচ হলেও এখন লাগছে ৬২০ টাকা। খরচ বাড়ায় তাদের চালানের সংখ্যা মাসে ৫-৬টি থেকে কমে ২-৩টিতে নেমেছে। সৌজন্যে খবরের কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত