শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:১১ পিএম, ২০২৬-০৪-২৪
বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে মাত্র তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা বলে মনে করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) পিআরআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস : বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি শীর্ষক সেমিনারে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা অংশ নেন। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে জাইদী সাত্তার বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব দেশ এই ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই এখন সেই নিয়ম লঙ্ঘন করছে। ফলে এই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিও ২-৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আরও কমার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি মজুদ বর্তমানে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত, বিনিময় হারের ধাক্কা, শুল্ক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ একাধিক অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করেছে। এর সঙ্গে এখন মধ্যপ্রাচ্য সংকট যুক্ত হয়েছে।
আইএমএফ কর্মসূচি প্রসঙ্গে সাত্তার বলেন, চূড়ান্ত কিস্তি প্রাপ্তি নির্ভর করছে বিনিময় হার সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ওপর। যদিও বৈদেশিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে এখনও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ২০২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ৭-৮ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কারণ আমদানি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির জন্য অপরিহার্য উপকরণ সরবরাহ করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিদ্যমান শক্ত ভিত্তিকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পবকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান তার মূল প্রবন্ধে বলেন, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং গত পাঁচ মাসে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি দ্বি-অঙ্কে পৌঁছেছে—যা আর্থিক খাতে আস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই পুনরুদ্ধার কিছু মৌলিক দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে, যা কোভিড সময়ের পর সর্বনিম্ন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানোয় আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছে। পাশাপাশি রাজস্ব খাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সরকার উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন তিনটি সমসাময়িক বহিরাগত চাপের মুখে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আসন্ন এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা। এসব চাপ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মাধ্যমে অর্থনীতির সর্বস্তরে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে রপ্তানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, আর সীমিত নীতিগত সক্ষমতা সামগ্রিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বেশিরভাগ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আত্মসৃষ্ট এবং সাহসী ও দেশীয় উদ্যোগে পরিচালিত সংস্কার জরুরি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত