জ্বালানির সংকটে অদৃশ্য মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়

Passenger Voice    |    ১১:০৪ এএম, ২০২৬-০৪-২৩


জ্বালানির সংকটে অদৃশ্য মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়

‘এই মুহূর্তে প্রধান সমস্যা দামের চেয়ে সরবরাহ ঘাটতি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি এড়ানোর সুযোগ সীমিত। তাই সঠিক নীতি, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।’

দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বহুমাত্রিক প্রভাব নিয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব পড়তে পারে?
জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষ—দুই ভাবেই পড়ে। পরিবহন খরচ বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ফলে পণ্যের দাম বাড়ে—এটাই সরাসরি প্রভাব। কিন্তু এর বাইরে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

মূল্য সমন্বয় না করলেও বাজারে কার্যত ‘অদৃশ্য মূল্যস্ফীতি’ তৈরি হচ্ছিল। সরকার নির্ধারিত দামে জ্বালানি সবাই পাচ্ছিল না। ফলে সময়ের অপচয়, লাইনে দাঁড়ানো বা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়া—এসবের অর্থনৈতিক মূল্য আছে, যা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

আরেকটি বড় প্রভাব হলো—দামের বিকৃতি থাকলে কালোবাজারি তৈরি হয়। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি—এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি হয়েছিল। কৃষক পর্যায়ে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে ডিজেল কিনতে হয়েছে।

মূল্য সমন্বয় না করলেও কি একই ধরনের প্রভাব পড়ছিল?
হ্যাঁ, মূল্য সমন্বয় না করলেও বাজারে বিকৃতি তৈরি হচ্ছিল। কৃত্রিমভাবে কম দামে জ্বালানি রাখলে কালোবাজার গড়ে ওঠে, যেখানে কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ে এবং কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়।

স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ না করার প্রভাব কী?
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে দাম সমন্বয় করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমানো। এই নিয়ম অনুসরণ না করায় নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কি কোনো বিকল্প ছিল?
বাস্তবে এমন কোনো বিকল্প নেই যা সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত। সরকার দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি দিয়ে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করেছে, ফলে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ আর বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই ব্যবহারকারীদের ওপর এর প্রভাব পড়া অনিবার্য হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত কী প্রভাব দেখা দিতে পারে?
মূল্যবৃদ্ধির ফলে যারা আগে কৃত্রিমভাবে কম দামে জ্বালানি পেতো, এখন তাদের প্রকৃত বাজারদরে কিনতে হবে, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। তবে ইতিবাচক দিক হলো—সরকারি ও বাজার দামের ব্যবধান কমে যাওয়ায় কালোবাজারের মুনাফা কমে আসবে।

কৃষকদের জন্য এই পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় কী?
কৃষকদের প্রধান সমস্যা দামের চেয়ে সরবরাহ ঘাটতি। পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তাদের অনেক সময় বেশি দামে কিনতে হয়।

তাই প্রথম কাজ হলো—সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে সেচ মৌসুমে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। যেমন— কৃষিকার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি বা ‘এনার্জি ভাউচার’ পদ্ধতি।

এ ব্যবস্থায় কৃষক বাজারদরে জ্বালানি কিনবে, কিন্তু সরকার তাকে নির্দিষ্ট সহায়তা দেবে। এতে অপচয় কমবে এবং ভর্তুকি সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর প্রভাব কমাতে কী করা যেতে পারে?
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর ও কার্যকারিতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরাসরি নগদ সহায়তা, বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দিলে দ্রুত ও সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প আছে কি?
যদি জ্বালানি না থাকে, তাহলে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে বিকল্প উৎস খোঁজা, নতুন বাজার থেকে আমদানি বা বিশেষ ব্যবস্থায় তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যদিও তা দেশের রিফাইনারি সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা বিবেচনা করা জরুরি।

রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে এর প্রভাব কী হতে পারে?
যারা আগে নির্দিষ্ট দামে রপ্তানি চুক্তি করেছে, তাদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে মুনাফা কমে যেতে পারে বা ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে এটি ব্যবসার স্বাভাবিক ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে সৃষ্ট এই পরিবর্তনের দায় সরকারের ওপর চাপানো কঠিন।

দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ, সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ অপরিহার্য। পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।