সড়কে এখনো আইন মানছে না কেউ

Passenger Voice    |    ১০:৫০ এএম, ২০২৬-০৪-২১


সড়কে এখনো আইন মানছে না কেউ

রাজধানীর বিজয় সরণির ব্যস্ত মোড়ে তখন তীব্রগতিতে ছুটে চলছিল নানা যানবাহন।  সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেল ৪টা। ফার্মগেটের দিক থেকে আসা যানবাহনগুলো এগোচ্ছিল ফ্লাইওভারের দিকে। তার মাঝেই কয়েকজন পথচারী চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়েই হুট করে ঢুকে দৌড়ে রাস্তা পার হন। একপর্যায়ে মোড়ের একপাশে লাল সিগন্যালবাতি জ্বলে উঠলেও গাড়িচালকদের দুরন্তপনা যেন থামে না। পুলিশ সদস্যরা লাঠি হাতে অনেক চলন্ত গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সিগন্যালে দাঁড় করালেন। এর মাঝেই কয়েকটি গাড়ি সিগন্যালের জেব্রাক্রসিংসহ সামনের আরও কিছু অংশজুড়ে অবস্থান নেয়। 

সোমবার বিজয় সরণি ট্রাফিক সিগন্যালে প্রায় ৩০ মিনিট অবস্থান করে এমন দৃশ্য দেখা যায়। কেবল বিজয় সরণি নয়, আরও বেশ কিছু এলাকায় ট্রাফিক আইন না মানা বা ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার চিত্র চোখে পড়েছে।

অন্যদিকে যানজট নিরসনে ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিজয় সরণি মোড়সহ রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয় ট্রাফিক সিগন্যাল অটোমেশন সিস্টেম। এই অটোমেশন সিস্টেমের কারণে সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলার কিছুটা উন্নতি হলেও আইন না মানার প্রবণতা এখনো বেশ চোখে পড়ার মতো। কিছু ক্ষেত্রে আবার ট্রাফিক পুলিশের নমনীয়তা বা অদক্ষতার সুযোগে রাজধানীর বেশির ভাগ সিগন্যালেই  যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় সড়কে ঘটছে নানা রকম দুর্ঘটনা। 

সোমবার রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর, বনানী, মহাখালী, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন সিগন্যাল ঘুরে দেখা যায়, যানবাহনগুলো নির্দিষ্ট লাইন অতিক্রম করে জেব্রাক্রসিংয়ের ওপর বা সেখান থেকে আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। অথচ ট্রাফিক আইন অনুসারে সিগন্যালে গাড়ি দাঁড় করানোর জন্য নির্ধারিত দাগ বা চিহ্ন রয়েছে। অন্যদিকে চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পথচারীদের সড়ক পারাপারের দৃশ্য দেখা যায় অহরহ। ফুটওভারব্রিজের ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক মোড়ে সেটিও নেই। পাশাপাশি প্রধান সড়কগুলোতে দেদার চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক। অনেক সময় সড়কের পুরো অংশজুড়ে যেন দখল করার মতো করে চলছিল এসব যানবাহন। এভাবে রাজধানীর সড়কগুলোতে ট্রাফিক আইন অমান্যের নানামুখী তৎপরতা দেখা গেলেও যানবাহন বা সেসব পথচারীর বিরুদ্ধে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সদস্যদের। বরং মোড় থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে টার্গেট করে যানবাহন থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা বা মামলা দিতে দেখা যায়।  

আলাপকালে দায়িত্বরত একাধিক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, সড়কে খুব অল্পসংখ্যক চালক ট্রাফিক আইন মানেন। বরং অধিকাংশই সঠিকভাবে সড়কে আইন মানেন না। এর বাইরে সড়কে পথচারীরা  কোনোভাবেই আইন মানতে চান না। এ বিষয়ে সচেতনতার সবচেয়ে বেশি অভাব রয়েছে। গতকাল সোমবার থেকে সিগন্যালগুলোতে ট্রাফিক সচেতনতায় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এটি নিয়মিত চলতে থাকবে। এর পরের ধাপে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী মে  মাস থেকে পুরোদমে ট্রাফিক সিগন্যাল অটোমেশন সিস্টেম চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এ জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। ক্যামেরা স্থাপন হয়ে গেলে অটোমেশন সিস্টেম চলবে। এতে যে আইন ভাঙবে তার বিরুদ্ধে অটোমেটিক মামলা হয়ে যাবে।  

বিজয় সরণি সিগন্যালে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মুসা আলী বলেন, ‘আমরা অটোমেশন সিস্টেমের পাশাপাশি নিজেরা সড়কে থেকে হাতের ইশারায় যানবাহন আপাতত নিয়ন্ত্রণ করছি। কারণ মানুষকে আগে এই সিস্টেমে অভ্যস্ত করতে হবে। অনেকটা হয়েছেও, তবে সড়কে পথচারীরা কোনো আইন মানতে চান না। অথচ তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। 

সোমবার বাংলামোটর মোড়েও যানবাহন ও পথচারীদের প্রচণ্ড চাপ ছিল। ছয়টি সড়কের সংযোগ স্থল। যানজট নিরসনে এই মোড়ে স্থাপন রয়েছে ট্রাফিক সিগন্যাল অটোমেশন সিস্টেম। তবে কেউ এর তোয়াক্কা করছেন না। অটোমেশন সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা ম্যানুয়ালি কাজ করছিলেন। যানবাহনগুলো জেব্রাক্রসিংয়ের ওপরে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। পথচারীরা এলোমেলোভাবে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। 

সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট সৈয়দ শরিফুল বলেন, যানবাহন আইন অমান্য করলে মামলা দেওয়া হয়। তবে পথচারীদের নিয়ন্ত্রণ করা বড় দায়। তারা আইন মানতে চান না। আসলে তাদের মধ্যে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। 

অন্যদিকে মহাখালী ফ্লাইওভারের মুখে যানবাহন চলাচল যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে জন্য গুলশান ট্রাফিক বিভাগ সোমবার সেখানে অবস্থান করে যানবাহন শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা করছিলেন। তারা সেখানে প্লাস্টিক কোণ দিয়ে ব্যারিকেড দিচ্ছিলেন। এবং হ্যান্ডমাইকের মাধ্যমে বলছিলেন, ‘যারা ফ্লাইওয়ারে উঠবেন তারা ডানে থাকুন এবং যারা মহাখালী সাতরাস্তায় যাবেন তারা বামে থাকুন। অযথা সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবেন না।’

সোমবার সেখানে উপস্থিত ছিলেন গুলশান ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগেও এখানে কোণ স্থাপন করেছিলাম। কিন্তু সেগুলো নিয়ে যায়। এতে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে যাওয়া যানবাহনগুলো ফ্লাইওভারে ওঠার মুখ বন্ধ করে ফেলে। এবার আমরা কিছুটা কঠোরভাবে এটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। তবে চালক ও পথচারীসহ সবাইকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।’ সৌজন্যে খবরের কাগজ