শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:২৬ পিএম, ২০২৬-০৪-২০
ঢাকার ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে আন্তজেলা পরিবহনে জ্বালানিসংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভাড়া বৃদ্ধি, বাসের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং শিডিউল ভেঙে পড়ার মতো সমস্যায় পড়েছেন যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পরিবহন খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ফকিরাপুলে হানিফ পরিবহনের কাউন্টারম্যান বাবুল মিয়া বলেন, তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভাড়ায়। ঢাকা-মৌলভীবাজার রুটে আগে ৫৭০ টাকা ভাড়া থাকলেও এখন তা বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই বৃদ্ধি কেবল একটি রুটে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য রুটেও ধীরে ধীরে ভাড়া সমন্বয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে পরিবহন কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে বাসের সংখ্যা কমিয়ে আনছে। মারছা পরিবহন, আইকনিক পরিবহনসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও বরিশাল রুটে নির্ধারিত বাসের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ইমপেরিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাবে, তাদের বিভিন্ন রুটে প্রায় অর্ধেক বাসই এখন চালানো যাচ্ছে না।
এনা পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক মামুন বলেন, ডিজেলসংকটে নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস দেড় থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। এমনকি নির্ধারিত সময়ে তেল না পাওয়ায় বাস ছাড়তেই পারেনি। যার ফলে যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠাতে হয়েছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবহন কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতির আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন রয়েল পরিবহনের কর্মীরা। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না; অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ৯০ লিটারের বদলে ৪০-৫০ লিটার সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি পেট্রলপাম্প থেকে তেল পেতে অতিরিক্ত অর্থ বা ‘টিপস’ দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে একটি বাসের পূর্ণ ট্রিপ সম্পন্ন করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাস কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে যাত্রীর সংখ্যায়ও। কিছু পরিবহন, যেমন: লন্ডন এক্সপ্রেস, যাত্রী কমে যাওয়ায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কমে সেবা দিচ্ছে। তবে দক্ষিণবঙ্গগামী রুটে, বিশেষ করে গুলিস্তান এলাকায়, যাত্রীদের ভিড় এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় চাহিদা কমেনি, বরং সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি পরিবহন খাতে একটি দ্বৈত সংকট তৈরি করেছে। একদিকে জ্বালানির সীমিত সরবরাহের কারণে পরিবহন সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বাড়ায় ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের জন্য ব্যয় বাড়ছে, আর পরিবহনের মালিকদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।
রবি পরিবহনের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে শুধু সেবা নয়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিও হুমকির মুখে পড়বে। এমনকি কর্মীদের বেতন দেওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা না এলে পরিবহন খাতের এই অস্থিরতা আরও গভীর হতে পারে। এতে পণ্য পরিবহনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ডিজেলের দাম বাড়ায় ভাড়া সমন্বয়ের দাবি পরিবহন মালিকদের
প্রায় দেড় মাসের জ্বালানিসংকটের পর বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। গত ১৮ এপ্রিল রাত থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে, যা পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় বাস ও ট্রাক মালিকদের সংগঠনগুলো দ্রুত ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। মালিক নেতারা বলছেন, নতুন দামে জ্বালানি কিনে পুরোনো ভাড়ায় পরিবহন চালানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে এর আগে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ছিল প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি। পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা কমিয়ে সর্বশেষ ১০০ টাকায় আনা হয়েছিল।
তখন দূরপাল্লার বাস ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সময় মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৮০ পয়সা প্রস্তাব করা হলেও সরকার তা গ্রহণ না করে ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করে। পরে ২০২৫ সালের ১৬ জুন তা সমন্বয় করে ২ টাকা ১২ পয়সা করা হয়।
সর্বশেষ ডিজেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ার পর মালিকরা নতুন করে ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের দাবি, বর্তমান ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রতি কিলোমিটার ৪ টাকা ৫ পয়সা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস মালিক বলেন, ভাড়া নির্ধারণে শুধু জ্বালানির দামই বিবেচ্য নয়; গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, চাকা, ইঞ্জিন অয়েলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, ২০২২ সালে যে চাকার জোড়া ৫০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি ৭৪ থেকে ৮০ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আগে ১ হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যেত এমন যন্ত্রাংশ এখন ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাসের চেসিস ও বডি নির্মাণ খরচও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তার ভাষ্য, ২০২২ সালে একটি বাসের চেসিসের দাম ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ টাকায়। বডি নির্মাণ খরচও ১১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা হয়েছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে ওঠায় কিস্তির চাপও বেড়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একটি সূত্র জানায়, ডলারের দামের প্রভাব বিবেচনায় আগে থেকেই প্রতি কিলোমিটার ৩ টাকা ৭৫ পয়সার প্রস্তাব দেওয়া ছিল। নতুন করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে তা বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।
সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম গতকাল দুপুরে বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে। এখন বাস ভাড়া না বাড়ালে আমাদের তো ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করব। যাত্রীদের যাতে খুব বেশি ভোগান্তি পোহাতে না হয়, এমন একটি ভাড়া নির্ধারণ করব আজকালের মধ্যে।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত