শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:২২ পিএম, ২০২৬-০৪-২০
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতসহ নানা ক্ষেত্রে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রলপাম্পগুলোতে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। অনেক পাম্পে বন্ধ রয়েছে তেল বিক্রি, খোলা পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বাইক ও গাড়িচালকদের।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই তেলসংকটের প্রভাব এখন দৃশ্যমান রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর মোটরসাইকেলচালকসহ যাত্রীরা। বিশেষ করে খাবার ডেলিভারি ও রাইড শেয়ারিং পেশায় জড়িতরা পড়েছেন বেশি বিপাকে। তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন আয় কমে গেছে প্রায় অর্ধেক।
অন্যদিকে এই তেলসংকটের কারণে রাইড শেয়ারিং সেবার ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া দাবি করছেন, ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
পুরান ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাবিলা জানান, আগে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় মোহাম্মাদপুর যাতায়াত করতেন। কিন্তু বর্তমানে একই দূরত্বে যেতে ১৭০ থেকে ২০০ টাকার বেশি দাবি করা হচ্ছে, এর কমে কোনো চালক যেতে রাজি হচ্ছেন না।
বাংলামোটরে চাকরি করা এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে আমি লালবাগ থেকে বাইকে যাতায়াত করতাম ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, এখন সেখানে ২০০ টাকা পর্যন্তও চায়। এমনিই বাজারে সবকিছুর দাম বেশি নিয়ে হিমশিম খাওয়া লাগে। তার মধ্যে যাতায়াতের ভাড়া বাড়তে থাকলে আমরা যাব কই? তেলসংকটের অজুহাতে বাইকের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ নেওয়া হচ্ছে।’
কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে রাজধানীতে দ্রুত যাতায়াতের জন্য রাইড শেয়ারিং সেবা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সময় বাঁচাতে অনেকেই বাইকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে সাম্প্রতিক তেলসংকটে সেই সুবিধা এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিবহন খাতের এই অস্থিরতা আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।
তীব্র গরমে পেট্রলপাম্পে যারা জ্বালানি তেল নিতে আসেন তাদের অনেকেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। একেকজনের তেল নিতে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত লাগছে, আবার অনেকে রাতেও লাইনে থাকেন যেন সকালে পাম্প খুলতেই তেল নেওয়া যায়। তারপরও কর্মদিবসের প্রায় পুরো সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে জ্বালানি নিতে। এ কারণে চালকের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে দিয়েছেন অনেক গাড়ির মালিক।
আবার তেল নিতে বাড়তি সময় খরচ হওয়ায় ঘুম ও বিশ্রামের সময় কমে গেছে অনেকের। তীব্র এই গরমে যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের সংকট আরও বেশি। আর্থিক ক্ষতি পোষাতে বাড়তি সময় বাইক চালাতে হচ্ছে। এতে করে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানালেন কয়েকজন চালক।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানিসংকট শুরু হওয়ার আগে রাইড শেয়ারিং চালকরা তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিলেন। দৈনিক সব খরচ বাদ দিয়ে কম হলেও ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। জ্বালানিসংকট শুরুর পর বিশেষ করে ঈদের পর পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে। এখন অনেক চালক দিনে ৭০০-৮০০ টাকাও ঘরে নিতে পারছেন না। ফলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাঠাও রাইড শেয়ারিংয়ের কর্মীরা বলেন, ‘অন্য সময় দৈনিক এক হাজার টাকা আয় করা কোনো বিষয় ছিল না। আর এখন সারা দিন যায় তেল নিতে। সন্ধ্যার পর তেমন যাত্রী মেলে না, আমাদের ব্যাপক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।’
আরেক বাইকচালক বলেন, ‘প্রতিদিন তেল নিতে গিয়ে ৪-৫ ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়ায় এখন আর দিনে এক শিফটও ঠিকমতো কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগে দিনে দুই শিফটে কাজ করে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা আয় করলেও এখন তা কমে এক হাজার টাকায় নেমে এসেছে। পরিবার নিয়ে চলতে বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছি।’
বেশ কয়েকজন বাইকচালক জানান, অফিস খোলা থাকায় সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল সংগ্রহ সম্ভব হয় না। ফলে ছুটির দিনে বাধ্য হয়ে তেল কিছুটা থাকার পরও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
রাইড শেয়ারিং চালক রহমান রফিক বলেন, অনেক পাম্পেই তেল দেওয়া হচ্ছে না, ফলে যেসব পাম্প খোলা থাকে সেখানে অতিরিক্ত ভিড় হয়। মাত্র ৫০০ টাকার তেলে সারা দিন চলে না। বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হয়।
রাইড শেয়ারিং চালক সাইফুল বলেন, জ্বালানি নিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু অ্যাপগুলো কোনো ভাড়া বাড়ায়নি। নতুনবাজার থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত ভাড়া আগে যেমন ১৭০-১৮০ টাকা ছিল, এখনো তেমনই আছে। চুক্তিতে গেলে কখনো ২২০-২৫০ টাকা পাওয়া যায়, তবে সেটিও নিয়মিত নয়।
আরেক চালক মো. মুরাদ আলী বলেন, ‘আবুল হোটেল থেকে ধানমন্ডি শংকর পর্যন্ত অ্যাপে ভাড়া আসে ১৪০-১৬০ টাকা। চুক্তিতে গেলে কখনো ২০০ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু সারা দিন কষ্ট করে তেল তুলে যে আয় করি, তাতে তেমন লাভ থাকে না।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত