শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:৩৪ পিএম, ২০২৬-০৪-১৯
‘গত এক মাসে আমি মাত্র দুবার ফুয়েল (জ্বালানি) নিতে পেরেছি। সেটাও আবার কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর। ছেলেরা রাত ২টা-৩টার সময় গিয়েও লাইনে দাঁড়াতে পারে। মেয়েদের পক্ষে তো সেটা সম্ভব হয় না।’—বলছিলেন নারী বাইকার ফাহমিদা রশিদ মেঘলা।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত মেঘলা। নির্বিঘ্নে অফিসে যাতায়াতের জন্য ২০১৯ সালে মোটরবাইক কেনেন তিনি। গত সাত বছর এই বাইকই তাঁর পথসঙ্গী। তবে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে আজকাল প্রায়ই নিজের বাইক বাড়িতে রেখে অন্য পরিবহন খুঁজতে হচ্ছে তাঁকে। বাড়ছে খরচ আর ভোগান্তি, আছে নিরাপত্তা শঙ্কাও।
দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ, নিরাপত্তা শঙ্কা, সামাজিক অস্বস্তি—সব মিলিয়ে অনেক নারী বাইকারের জন্য স্কুটার বা মোটরসাইকেল চালানো এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কেউ বাইক ব্যবহার সীমিত করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প পরিবহনে ঝুঁকছেন।
ফাহমিদা রশিদ মেঘলা বলেন, ‘রমজানের মধ্যে একবার তেল নিয়েছিলাম। সেদিন প্রায় চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এরপর মার্চের ২৪ তারিখে আবার তেল নিয়েছি, সেদিনও তিন ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হয়েছে।’
নারী বাইকাররা বলছেন, ব্যাংক, হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় নারীদের জন্য আলাদা লাইন রাখা হয়। তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।
ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান, নারী চালকদের সংখ্যা খুব কম হওয়ায় কোনো নারী এলে সিরিয়াল ছাড়াই তাঁরা তেল দেন। কিন্তু অপেক্ষারত পুরুষ চালকেরা সেটা মানতে চান না।
নারী বাইকাররা জানান, কিছু কিছু ফিলিং স্টেশনে গেলে লম্বা লাইনে না দাঁড়িয়েও তাঁরা তেল নিতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়ানো পুরুষ বাইকারদের কটূক্তি শুনতে হয় তাঁদের।
অনলাইন নিউজ পোর্টাল চরচা ডটকমের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেরিনা মিতু বলেন, কয়েক দিন আগে ফিলিং স্টেশনে আমার পাশে থাকা এক নারী বাইকার সিরিয়ালে না দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছিল। ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা কোনো সমস্যা করেনি। তবে সেখানে থাকা পুরুষ বাইকাররা ওই নারীকে যে ভাষায় কটূক্তি করেছিল, তা দেখে আমি সেই প্রিভিলেজটা (সুবিধা) নিইনি।’
রূপালী বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিনিধি স্বপ্না চক্রবর্তী বলেন, দেড় মাস ধরে তেল নিতে গেলে কোনো না কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন হাজার হাজার বাইকের সিরিয়াল থাকে। পুরুষেরা রাতে গিয়ে লাইন ধরে। নারীদের পক্ষে তো সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ৪৮ লাখের বেশি। তবে এর তুলনায় নারী বাইকারের সংখ্যা খুবই কম। দেশে নারী ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী রয়েছেন ৪ হাজারের মতো; যার প্রায় অর্ধেকই ঢাকায় থাকেন।
বাংলাদেশ উইম্যান রাইডারস ক্লাবের তথ্যমতে, দেশে ২ হাজারের বেশি নারী সক্রিয়ভাবে মোটরসাইকেল চালান। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই কর্মজীবী নারী বা শিক্ষার্থী।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, যেকোনো দুর্যোগ বা সংকটে নারীদের ভুগতে হয় সবচেয়ে বেশি। জ্বালানি সংকটও এর ব্যতিক্রম নয়। নারীদের জন্য এটা জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা সংকটও তৈরি করছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারী চালকদের আলাদা সিরিয়ালের কথা বললে পুরুষেরা সবার সমান অধিকারের যুক্তি দেখায়। কিন্তু একজন নারী যদি রাতে ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়ায়, সে নিরাপদে বাড়িতে ফিরতে পারবে কি না, সেই নিরাপত্তা তো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারছে না। তাহলে তাদের জন্য তো আমাদের আলাদা ব্যবস্থা থাকা উচিত।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত