শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৩৩ এএম, ২০২৬-০৪-১৯
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) অধিকাংশ ডিপোতে বাড়ছে লোকসানি বাসের সংখ্যা, অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে রাজস্ব কমেছে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাক ডিপোগুলোতে। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাস ইউনিটগুলোর কার্যক্ষমতা ও রাজস্ব আয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বিআরটিসির সাম্প্রতিক এক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে অপারেশনাল বাস কমার পাশাপাশি বেড়েছে লোকসানে চলা বাসের সংখ্যাও। এখন জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
বাস ডিপোর চিত্র: অধিকাংশ ইউনিটেই লোকসান
বিআরটিসির তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি মাসে বরিশাল, বগুড়া ও টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো বাদে সব ডিপোতেই অপারেশনাল বাসের সংখ্যা কমেছে। এ ছাড়া বরিশাল, বগুড়া ও রংপুর বাদে বাকি সব ডিপোতে সচল বাসের ১০ শতাংশের বেশি ‘বসা’ বা অকেজো অবস্থায় ছিল।
রাজস্ব আদায়ের চিত্রটিও হতাশাজনক। বিআরটিসির পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) মো. রাহেনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বরিশাল, দিনাজপুর, খুলনা ও টুঙ্গিপাড়া ছাড়া বাকি কোনো ডিপোই বাসপ্রতি ধার্যকৃত রাজস্ব (টার্গেট) পুরোপুরি পরিশোধ করেনি। ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল, কল্যাণপুর, খুলনা, রংপুর, সোনাপুর, কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা (আইসিডব্লিউএস), ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাস ডিপো বাদে অন্য সব ইউনিট লোকসানের মুখে পড়েছে।
জানুয়ারিতে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও পাবনা ডিপো বাদে অন্য কোনো ডিপো তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ট্রিপ (টার্গেট ট্রিপ) পূর্ণ করতে পারেনি। লোকসানি বাসের সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী; জানুয়ারিতে যেখানে ৪৫টি বাস লোকসানে ছিল, ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩টিতে।
আয় কমেছে ট্রাক ডিপোতে
রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থার অন্যতম আয়ের উৎস ট্রাক ডিপোগুলোতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব অর্জিত হয়েছে ৯ কোটি ৭২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, যা জানুয়ারির (১০ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা) তুলনায় ৪৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা কম। একই অবস্থা ঢাকা ট্রাক ডিপোতেও। সেখানে জানুয়ারি মাসের ৭ কোটি ৯৩ লাখ ৮২ হাজার টাকার বিপরীতে ফেব্রুয়ারিতে আয় হয়েছে ৭ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, অর্থাৎ আয় কমেছে ৬৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এই পরিস্থিতিতে টু-পেসহ ট্রাকের রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বাসের সংখ্যা পরিবর্তন
ফেব্রুয়ারি মাসে বহরে নতুন বাস যুক্ত হওয়ার তালিকায় এগিয়ে আছে মতিঝিল (১১টি), গাবতলী (৪টি), টুঙ্গিপাড়া (৪টি), বগুড়া (৩টি), নারায়ণগঞ্জ (৩টি) ও মোহাম্মদপুর (১টি)। অন্যদিকে রংপুর, দিনাজপুর, গাজীপুর ও মিরপুর ডিপোতে বাসের সংখ্যা কমেছে।
উল্লেখ্য, বিআরটিসির স্টাফ বাস পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনিয়ম দেখা গেছে। অন্যান্য ডিপো শুক্র ও শনিবার স্টাফ বাস চালালেও বরিশাল, রংপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, নরসিংদী, সিলেট ও টুঙ্গিপাড়া ডিপো ওই দিনগুলোতে স্টাফ বাস পরিচালনা করেনি।
জ্বালানি খরচ ও যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে কড়াকড়ি
জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণে কঠোর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ। তথ্যমতে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বগুড়া, দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার ডিপো নির্ধারিত হারের চেয়ে ৫০ শতাংশের বেশি জ্বালানি ব্যয় করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাসের ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ এবং ট্রাকের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
ডিপোগুলো থেকে পাঠানো ‘ব্রেক ডাউন’ বা যান্ত্রিক ত্রুটির তথ্য এখন থেকে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) দিয়ে যাচাই করা হবে। যদি কোনো বাস সচল থাকা সত্ত্বেও ভুল তথ্য দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ডিপোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং রাজস্ব আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হবে।
অনাদায়ী অর্থ ও প্রশাসনিক জটিলতা
বিআরটিসির অর্থ বিভাগে বড় অঙ্কের অর্থ অনাদায়ী পড়ে আছে। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালক ও কন্ডাক্টরদের কাছ থেকে ৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা অনাদায়ী রয়েছে।
জেনারেল ম্যানেজার (হিসাব) আবদুল্লাহ আল মাসুদ জানিয়েছেন, গত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিপিএফ বাবদ ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং গ্রাচ্যুইটি বাবদ ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি।
একই রুটে ভিন্ন ভিন্ন ডিপোর বাস পরিচালনার ফলে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে ইউনিটপ্রধানরা জানিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা নির্দেশ দিয়েছেন, একই রুটে একাধিক ডিপোর বাস না চালিয়ে নির্দিষ্ট ডিপোর নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় করে বাস পরিচালনা করতে হবে।
লাভ বাড়াতে ৫ সদস্যের কমিটি
ডিপোভিত্তিক আয় বাড়ানো এবং ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে নিট লাভ নিশ্চিত করতে পরিচালককে (অর্থ ও হিসাব) আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি ডিপোর আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে সরাসরি চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন পেশ করবে। বর্তমানে ব্যাংক স্থিতি থাকা সাপেক্ষে প্রতিদিনের নিট লাভের আংশিক অর্থ পরবর্তী দিন বিআরটিসির কোষাগারে জমা দেওয়া হচ্ছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত