পাম্পে দীর্ঘ লাইন, বাহনের শুরু আছে শেষ যেন নেই

Passenger Voice    |    ১০:৩৫ এএম, ২০২৬-০৪-১৮


পাম্পে দীর্ঘ লাইন, বাহনের শুরু আছে শেষ যেন নেই

জ্বালানি তেল সংগ্রহে চরম ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্র। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও এ ভোগান্তি থেকে রেহাই মিলছে না। গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। এ লাইনের যেন শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

অনেক গ্রাহককে লাইনে অপেক্ষা করতে করতে বাসা থেকে আনা খাবার খেতে দেখা গেছে। তীব্র রোদে কেউ গাছের ছায়ায়, কেউ ভবনের পাশে সামান্য ছায়া খুঁজে নিয়ে সময় পার করছেন। গতকাল রাজধানীর পরীবাগ, আগারগাঁও, আসাদগেট, বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন এসব চিত্র দেখা গেছে। ভোররাত থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হতে শুরু করে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ একসঙ্গে বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই লাইন আশপাশের অলিগলিতেও ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।

বিজয় সরণির পাশে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, গাড়ির দীর্ঘ লাইন জাহাঙ্গীর গেট পেরিয়ে মহাখালী পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এখানেই শেষ নয়, যানবাহনের লাইনটি আবার তেজগাঁও হয়ে বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের ওপরেও গিয়ে ঠেকেছে। যেন গাড়ির এই সারির কোনো শেষই নেই। কয়েক হাজার যানবাহন সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের সংখ্যাই বেশি।

একই চিত্র দেখা গেছে পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনেও। সেখানে তিন স্তরে গাড়ির লাইন তৈরি হয়েছে। একটি লাইন প্রধান সড়কে, আরেকটি পিজি হাসপাতাল হয়ে হাতিরপুলের দিকে চলে গেছে। অন্যটি বাংলামোটর হয়ে ইস্টার্ন প্লাজা মার্কেটের দিকে চলে গেছে। তৃতীয় লাইনটি পাম্পের পাশের গলি দিয়ে মোতালিব প্লাজার দিকে বিস্তৃত হয়েছে। এতে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম ভোগান্তি ও যানজট।

চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ আবার গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু এত কষ্টের পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

এক মোটরসাইকেলচালক রাজীব বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় তেল মেলে না। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রাইড শেয়ারকারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আব্দুল আজিজ নামে আরেক চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার বলছে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে পাম্পে গিয়ে আমরা তেল পাচ্ছি না। তাহলে তেল যাচ্ছে কোথায়?’

অন্যদিকে সেলিম নামের এক চালক জানান, কিছু পাম্পে চালু করা ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ ব্যবহার করতে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তার ভাষায়, অ্যাপে লগইনই করা যাচ্ছে না, পাসওয়ার্ড নেয় না। আবার নির্ধারিত কোটার বাইরে তেলও দিচ্ছে না।

এদিকে সরকারের সংশ্লিষ্টরা বরাবরের মতোই দাবি করছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই, বরং ইতিহাসের সর্বোচ্চ মজুত রয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের জানান, এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সরবরাহ লাইনে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং জুন মাসের চাহিদা মেটাতেও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা চলছে। আবার পরিশোধন বন্ধ থাকায় পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে মনোযোগ দিয়েছে সরকার। ২০২৯ সাল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কার্যক্রম শুরু হবে।

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, তারা নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন, কিন্তু হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু গ্রাহকের অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। 

পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। ‘জ্বালানিসংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক এক সংলাপে আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহনে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সাইকেল ও পদচারীবান্ধব সড়ক তৈরি করলে জ্বালানির ওপর চাপ কমবে। পণ্য পরিবহনে রেলপথ ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

সংলাপে বাংলাদেশ ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট ফোরামের সভাপতি সাজেদুল হক বলেন, নগর উন্নয়নে এলোমেলো ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তনির্ভর পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে। তিনি গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াতব্যবস্থা, সমন্বিত বাস রুট পরিচালনা, ছায়াযুক্ত ফুটপাত ও পৃথক সাইকেল লেন নির্মাণের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সামাজিক আচরণে পরিবর্তন, রিকশাকে আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যুৎচালিত ও হাইব্রিড যানবাহনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে টেকসই নগর তৈরি করার আহ্বান জানান।

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, গণপরিবহন সম্প্রসারণ, সাইকেল লেন ও নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।