শিরোনাম
ভারমুক্ত চেয়ারম্যানের পদ ভাগাতে চেষ্টা
Passenger Voice | ০৩:০৫ পিএম, ২০২৬-০৪-১৪
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃৃপক্ষের এক সময়ে পরিচালক অপারেশনের চেয়ারটি সামলাতেন সংস্থাটির শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা শীতাংশু শেখর বিশ্বাস। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইয়াসিন বিআরটিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর বিশ্বস্ত যুগ্নসচিব মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে নিয়ম লঙ্ঘন করে অপারেশন উইং পদে পদায়ন করেন। বিআরটিএ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরেও সংস্থাটিতে এই প্রথম কোন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে পরিচালক (অপারেশন) পদে পদায়ন করা হয়েছিল। যা নিয়ে ক্ষিপ্ত ছিল বিআরটিএর সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বিআরটিএর সংস্থাপন শাখার ৫ই মার্চ তারিখের নং-৩৫.০০.০০০০.০২০.০৮.০০১.২৬-১০৩ সংখ্যক স্বারকের আদেশে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ্ উদ্দিন আহমেদের অবসরজনিত কারণে প্রশাসনিক কাজ চলমান রাখার স্বার্থে পরিচালক (অপারেশন) অতিরিক্ত সচিব মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে বিআরটিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। দায়িত্ব পেয়েই প্রকাশ্যে আসে চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার চেষ্টায় ৭ই মার্চ শনিবার ছুটির দিন নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৪৯৮ সংখ্যক স্মারকে সংস্থাটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিঃ) পদে বদলি করেন। একই সাথে বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে বিআরটিএর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের পরিচালক (ইঞ্জিঃ), চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ) মোঃ সানাউল হককে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিঃ), কে.এম মাহাবুব কবিরকে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ), পার্কন চৌধুরীকে উপপরিচালক (অপারেশন) পদে স্বেচ্ছাচারিতার বদলি করেন।
বিআরটিএর সূত্র বলছে, তারিকুল ওমরের এই আদেশটির উদ্দেশ্য ছিল বিআরটিএর পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ও উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ) দের মাঝে ব্যক্তিগত রেশারেশি ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রুপিং এর মাধ্যমে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। উক্ত আদেশের মাধ্যমে বিআরটিএর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মাসুদ আলমকে পরিচালক (ইঞ্জিঃ) পদে বদলি করে পরিচালক (ইঞ্জিঃ) পদে কর্মরত মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর সাথে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব তৈরি করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে অবগত হওয়ায় বিআরটিএর সদর কার্যালয়ের ৯ই মার্চ তারিখের নং-৩৫.০৩.০০০০.০০১.০১৯.০১০৮.২৫-৫২৫ সংখ্যক স্মারকে বদলির আদেশটি বাতিল করা হয়।
তরিকুল ওমরের ফাঁদে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আব্দুর রশীদঃ বিআরটিএর সিলেট সার্কেলে ৫ হাজার নতুন সিএনজি নিবন্ধনের গুঞ্জন রয়েছে। উক্ত নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের স্বপ্ন দেখিয়ে গত ৬ এপ্রিল নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৭১১ সংখ্যক স্মারকের আদেশে সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আব্দুর রশীদকে সিলেট সার্কেলে বদলি করা হয়। একই সাথে হবিগঞ্জ সার্কেলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান বিআরটিএর কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের মতে এমন স্বপ্ন আব্দুর রশীদকে আগেও দেখানো হয়েছিলো। ২০২৪ সালের ১৮ই নভেম্বর নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০১.১৯.১৭৬.২৪-১৯৪৩ সংখ্যক স্মারকে বিআরটিএর রাজশাহী সার্কেল থেকে আব্দুর রশীদকে সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়, একই সাথে সুনামগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। এরপর ২০২৫ সালের ২৯ জুন নং-৩৫.০৩.০০০০.০০১.১৯.১৩২.২৩-১৩১৮ সংখ্যক স্মারকে তাকে বিভাগীয় অফিস থেকে সিলেট জেলা সার্কেলে বদলী করা হয়। পরবর্তীতে ১ সেপ্টেম্বর নং-৩৫.০৩.০০০০.০০১.১৯.১৭৬.২৪-১৮৪০ সংখ্যক স্মারকে এই কর্মকর্তাকে আবারও বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলী করা হয়। সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিলে পুনরায় তাকে সিলেট জেলা সার্কেলে পদায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর ১৬৭৭ নং আদেশ মতে বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) খালিদ মাহমুদকে সংস্থাটির বিভাগীয় অফিস বরিশালে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জারি করা ১৮৪০ নং আদেশে খালিদ মাহমুদকে সিলেট জেলা সার্কেলে পদায়ন করা হলে কোনো অপরাধ না থাকার পরেও ৭ মাসের মাথায় ৬ এপ্রিল ৭১১ নং আদেশে তাকে ভোলা সার্কেলে পদায়ন করা হয়।
অপরদিকে ২০২৫ সালের ২রা নভেম্বর স্মারক নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-২৫০৫ সংখ্যক আদেশে বিআরটিএর সদর কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক মোঃ তাজুল ইসলামকে বিআরটিএর ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করে সংস্থাটি। ৪ মাসের মধ্যে বিশেষ আর্থিক সুবিধা নিয়ে গত ৯ই এপ্রিল নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৭৫৭ সংখ্যক আদেশ মূলে তাকে “ক” ক্যাটাগরির ঢাকা বিভাগীয় সার্কেল হতে “ক” ক্যাটাগরির কুমিল্লা সার্কেলে বদলি করা হয়। অথচ সংস্থাটির অনেক সার্কেল অফিসে মোটরযান পরিদর্শকদের একই কর্মস্থলে ৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও শত চেষ্টা করেও আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় বদলি নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
বিআরটিএর সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ১৮ই নভেম্বর ১৯৪৩ নং আদেশমূলে বিআরটিএর গাজীপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মোহাম্মদ হারুন উর রশীদ মোটা অঙ্কের লেনদেনে বগুড়া সার্কেলে বদলি হন। বগুড়া সার্কেলে যোগদানের পর বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলে বদলি হতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। মোটরযান পরিদর্শক থেকে সহকারী পরিচালক(ইঞ্জিঃ) পদে পদোন্নতি পেয়ে জিয়াউর রহমার ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখায় পদায়ন হলে এই কর্মকর্তাকে সরিয়ে উক্ত শাখার সহকারী পরিচালক পদে বদলি হওয়ার জোর তদবির চালিয়েছেন হারুন উর রশীদ। সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর গত ১২ই এপ্রিল স্মারক নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৭৭৭ সংখ্যক আদেশে জিয়াউর রহমানকে বগুড়া সার্কেলে বদলি করিয়ে হারুন উর রশীদকে ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলে পদায়ন করা হয়। বিআরটিএর বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে “ক” ক্যাটাগরির গাজীপুর সার্কেল থেকে বগুড়া সার্কেলে এবং বগুড়া থেকে ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলে বদলি ও পদায়ন কর্মকর্তাদের মাঝে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে।
একই সাথে ২০২৫ সালের ৩১শে আগস্ট নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০১.১৯.১৩২.২৩-১৮৩১ সংখ্যক স্মারকে কুড়িগ্রাম সার্কেল থেকে ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলে বদলি হয়ে আসা সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মোঃ রিয়াজুল ইসলামকে একই আদেশে বিআরটিএর ঝালকাঠি সার্কেলে বদলি করা হয়। এর পূর্বে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর রিয়াজুল ইসলামকে সিলেট জেলা সার্কেল থেকে কুড়িগ্রাম সার্কেলে বদলি করা হয়েছিলো।
এই আদেশে রিয়াজুল ইসলাম, পলাশ খীসা, জিয়াউর রহমান ও মোহাম্মদ হারুন উর রশীদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বগুড়া সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলে বদলির জন্য মোটা দাগে তদবির করলেও রিয়াজুল ইসলাম ও পলাশ খীসার বদলির কারণটি ধোয়াশায় রয়েছে।
চেয়ারম্যানের এমন স্বেচ্ছাচারিতা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নজরে আসলে গতকাল ১৩ই এপ্রিল ৭৯৫ নং স্বারকের আদেশে পূর্বের বদলি আদেশটি বাতিল করা হয়।
অপারেশন শাখা চালাতে ব্যর্থ তারিকুল ওমরঃ দেশে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং কার্যক্রম। জরুরি ভিত্তিতে কিছু প্রিন্ট হলেও এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রিন্টিংয়ের জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই নতুন ঠিকাদার খুঁজছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এতে ঝুলে আছে ১০ লাখের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স। প্রিন্টিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন বিদেশগামী কর্মীরা। বিআরটিএর হয়ে এতদিন গ্রাহকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট করে দিত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেড (এমএসপি)। গত ২৮ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিআরটিএর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এদিকে ড্রাইভিং লাইসেন্সের এ সংকটের জন্য বিআরটিএর কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন, পুরনো ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত ছিল। পুরোনো ঠিকাদার যেদিন চলে যাবে, সেদিন থেকেই দায়িত্ব নেবে নতুন ঠিকাদার—প্রক্রিয়াটি এমন হওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু বিআরটিএ ব্যর্থ হওয়ায় লাখ লাখ গ্রাহক হয়রানির মধ্যে পড়েছেন। একটি শাখা পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার পরেও এই কর্মকর্তাকে বিআরটিএর চেয়ারম্যানের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব প্রদান করায় সংস্থাটির লেজেগোবরে অবস্থা বানিয়ে ফেলেছে।
এই বিষয়ে জানতে বিআরটিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত