মুনাফা দেখানো ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩ হাজার কোটি টাকা

Passenger Voice    |    ১১:১৬ এএম, ২০২৬-০৪-১৩


মুনাফা দেখানো ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ্যে মুনাফায় থাকা ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ ইসলামী ব্যাংক প্রকৃত পক্ষে বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে একথা জানা গেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির গুপ্ত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। 

যেকোনো ব্যাংকের আর্থিক চিত্র নির্ধারিত হয় ব্যাংকটির মুনাফা দিয়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল শীর্ষে। প্রতিবছর তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। করোনার সময়ের দুই বছর বাদে প্রতিবছরই সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে ব্যাংকটি। 

২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত অর্জিত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংক মুনাফা দেখায়। তবে তা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নয়। এদিকে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেও মুনাফা দেখিয়েছে ব্যাংকটি। সব ব্যাংক ২০২৫ সালের মুনাফা ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক মুনাফা ঘোষণা করেনি। 

এর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের আইটি বিভাগের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক হয়তো তার আর্থিক বিবরণীতে কিছু মুনাফা দেখাবে কিন্তু বাস্তবে বিশাল অঙ্কের লোকসান রয়েছে ব্যাংকটিতে, যা এখন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। তিনি আরও বলেন, বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকালে এ রকম তথ্য গোপনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও সহায়তা পাওয়া যেত। এখন তা না পাওয়াতে মুনাফা ঘোষণা করতে পারছে না ব্যাংকটি। 

ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, যখন কোনো ঋণ (বিনিয়োগ) খেলাপি হয়ে যায়, তখন যেদিন থেকে বকেয়া হয়, সেদিন থেকে আর কোনো মুনাফা আরোপ করা যায় না। তার পরিবর্তে সেখানে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়। এই ক্ষতিপূরণের অর্থ ব্যাংকের মুনাফায় নেওয়া যায় না। ইসলামী শরিয়াহর বিজ্ঞ আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এই ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্পাদন করা যাবে। কিন্তু বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক সে মূলনীতি থেকে সরে এসে ওই ক্ষতিপূরণের টাকাও মুনাফায় অন্তর্ভুক্ত করছে। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগে ক্ষতিপূরণ আরোপের দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগটি হচ্ছে ক্ষতিপূরণ আদায়যোগ্য এবং দ্বিতীয় ভাগটি হচ্ছে ক্ষতিপূরণ আদায় হয়েছে। প্রতি মাসে খেলাপি ঋণের (বিনিয়োগ) ওপর ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়, যা গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় হলেই ক্ষতিপূরণ আদায় হয়েছে বলে দেখানো যায়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক ওই আদায়যোগ্য ক্ষতিপূরণের টাকাও মুনাফায় অন্তর্ভুক্ত করছে, যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। আর এই পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংক এখন পর্যন্ত মুনাফা দেখালেও প্রকৃত অর্থে ব্যাংকটি এই পরিমাণ লোকসানে আছে। এটি শরিয়াহর দৃষ্টিতে হারাম এবং প্রচলিত ব্যাংকিং নীতির পরিপন্থি।

লোকসানে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা দেখানো হচ্ছে, তা জানতে ব্যাংকের আর্থিক প্রশাসন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগের আদায়কৃত ক্ষতিপূরণের টাকা মুনাফা হিসাবে দেখানো হচ্ছে। এতেও লোকসান থাকায় বকেয়া ক্ষতিপূরণও মুনাফা হিসাবে দেখানো হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকিং নীতি অনুসারে যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ইসলামি শরিয়াহ আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির অনুমোদন আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু লোকসান দেখালে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হবে এবং আমানত কমে যাবে, তাই আদায় না হলেও ক্ষতিপূরণকে মুনাফা হিসাবে দেখানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। 

এ ব্যাপারে ইসলামি শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটা ইসলামি ব্যাংকিং নীতির পরিপন্থি গর্হিত অপরাধ এবং সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের চেয়েও মারাত্মক। এতে মানুষের মনে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে বিভ্রান্তি ও ফিতনা সৃষ্টি হবে। তারা এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে যদি প্রকৃত অর্থে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এলে অবশ্যই বিশেষ নিরীক্ষা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিরীক্ষা করলে ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র বের হয়ে যাবে– এমন আশঙ্কায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।’ 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান শ্রেণিকৃত ঋণ (বিনিয়োগ) ৪৮ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ। যেখানে ৫ আগস্টের আগে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের শ্রেণিকৃত ঋণ কীভাবে হলো জানতে চাইলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান ম্যানেজমেন্ট এবং পর্ষদের অপেশাদার ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের এ বিশাল উল্লম্ফন। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর এস. আলম গ্রুপের ব্যবসা-বাণিজ্য জোরপূর্বক বন্ধ করে দিয়ে গ্রুপটির সব ঋণ খেলাপি দেখানো হয়। এ সুযোগে অন্য ব্যবসায়ীরা ঋণের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেন। তিনি আরও বলেন, যেখানে ব্যাংকের বর্তমান খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সেখানে এস. আলমের ঋণ ৬২ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৬৮ হাজার কোটি টাকা অন্য গ্রাহকদের, যা বিগত ১৮ মাস সময়ে খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তাদের খেলাপি আদায়ের ব্যাপারে কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। শুধু মামলা করে তারা দায়িত্ব শেষ করেন। এস. আলমের ওপর দোষ চাপিয়ে এভাবে একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ব্যাংককে লোকসানি ব্যাংকে পরিণত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যাংকের এমডি থেকে শুরু করে নির্বাহী কর্মকর্তাদের সবাই একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। ব্যাংকের এইচআর পলিসিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতিতে জড়ানো সম্পূর্ণ নিষেধ। ব্যাংকারদের ব্যাংকিং বাদ দিয়ে রাজনীতিতে জড়ানোও এ ব্যাংকের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর্থিক খাত সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যার ধারাবাহিকতায় ব্যাংকের একজন পরিচালককে অপসারণ করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে অসংখ্য, অবর্ণনীয় অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অন্য পরিচালক ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এখনো স্বপদে বহালতবিয়তে রয়ে গেছেন। তাদের অপসারণ না করলে এ ব্যাংক আরও সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সার্বিক বিষয়ে মতামত জানতে ব্যাংকের বর্তমান এমডি ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই তিনি ঘোষণা করেন যে, ইসলামী ব্যাংক থেকে এস. আলম গ্রুপ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে হাতিয়ে নিয়েছে এবং তা দেশের বাইরে পাচার করেছে। এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটিতে স্বতন্ত্র পরিচালকের মাধ্যমে পর্ষদ পুনর্গঠন করে দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পরই তিনি ঘোষণা করেন, ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। শরিয়াভিত্তিক আরও কয়েকটি ব্যাংকের ব্যাপারে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, এসব ব্যাংক দুর্বল। শুরুতে ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি সেই ব্যাংকগুলো থেকেও গ্রাহকের টাকা উত্তোলনের হিড়িক লেগে যায়। পরে ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে–গভর্নরের এমন বক্তব্যে ব্যাংকটি থেকে আমানত উত্তোলন কিছুটা কমে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের বিশেষ গোষ্ঠী ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় অতীতে জঙ্গি অর্থায়নসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যায় ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় দখল করে ওই রাজনৈতিক দলের সাবেক ও বর্তমান ব্যাংকারদের দিয়ে পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্ট গঠন করা হয়। ব্যাংক সংস্কারের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে তাদের এক ধরনের ওপেন চেক অনুমোদন দেয়। এতে বেসরকারি খাতে দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের করুণ পরিণতি হয়েছে। শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংক খাতেই তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা। 

জানা গেছে, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একটি রাজনৈতিক দলের অধীনে এই ব্যাংকটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। জঙ্গি অর্থায়ন ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ফলে ব্যাংকটি যখন দেশ-বিদেশে ব্যাপক ইমেজসংকটে পড়ে তখন তদানীন্তন শেয়ারহোল্ডাররা তাদের শেয়ার বিক্রয় করে দেন এবং নতুন উদ্যোক্তারা ওই শেয়ারের মালিকানা কিনে নেন। পরবর্তী সময়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন শেয়ারমালিকদের সমন্বয়ে পর্ষদ গঠন করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে ব্যাংক তার হারানো ইমেজ ফিরে পায়। যেখানে ১৯৮৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত ছিল ৬৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত ছিল ১৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ ওই সময়ে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে, যা ব্যাংকের পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনার প্রতি আমানতকারীদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। এভাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক রেমিট্যান্স, মুনাফা ও অন্য সব ক্ষেত্রে এ ব্যাংক শীর্ষস্থানে পৌঁছে যায়। দেশের প্রবাসী আয়ের এক-তৃতীয়াংশ এ ব্যাংকের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছিল।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির বর্তমান ম্যানেজমেন্ট ও পর্ষদ নানা আশার বাণী শুনিয়ে দাবি করেছিল যে, ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যদিও ব্যাংকটির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে ব্যাংকটির প্রকৃত আমানত বৃদ্ধির হার অনেক কম। 

যদিও ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৫ আগস্ট থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ২০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংকের প্রকৃত আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ অর্ধেকেরও কম। কারণ উক্ত সময়ের মধ্যে পূর্বের আমানতের ওপর ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত মুনাফা যুক্ত হয়ে বর্তমান আমানতের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে।