হেয়ার কাট বাতিল করে স্বাভাবিক ব্যাংকিংয়ের দাবি একীভূত ব্যাংকের আমানতকারীদের

Passenger Voice    |    ১১:৩৯ এএম, ২০২৬-০৪-০৮


হেয়ার কাট বাতিল করে স্বাভাবিক ব্যাংকিংয়ের দাবি একীভূত ব্যাংকের আমানতকারীদের

হেয়ার কাট বাতিল করে সুদসহ পুরো টাকা ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক ব্যাংকিংয়ের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান ফটকের সামনে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা। এ সময় পদ্মা ব্যাংকের আমানতকারীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এ সময় ‘তুমি কে আমি কে, আমানতকারী, আমানতকারী’সহ তাদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এদিকে আমানতকারীদের বিক্ষোভ চলাকালে বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, কোনো গ্রাহক অসুস্থ থাকলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে নিজ নিজ ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন।

একীভূত করা ব্যাংক পাঁচটি হলো ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। এই ব্যাংকের আমানতকারীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এসব ব্যাংকের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের ওপর ৪ শতাংশ করে সুদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা ‘হেয়ার কাট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কাফনের কাপড় পরে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। ‘ভুক্তভোগী আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন’-এর ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে অনেকেই ব্যাংকিংব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানোর কথা জানান। এ সময় বক্তারা অভিযোগ করেন, সাবেক গভর্নরের সিদ্ধান্তে আমানতের ওপর গত দুই বছরের ৪ শতাংশ করে মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অমানবিক ও অন্যায্য। অনেক আমানতকারী এসব ব্যাংক থেকে মূলধন ও মুনাফা তুলতে পারছেন না। এতে অনেকেই কষ্টে জীবনযাপন করছেন। তারা ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করে মুনাফাসহ পুরো আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি স্বাভাবিক লেনদেন শুরুর দাবি জানান।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক আমানতকারী বলেন, ‘ডাকাতের ভয়ে ঘরে টাকা রাখিনি, ব্যাংকে রেখেছিলাম। এখন দেখি এখানেও ডাকাত! তাহলে আমরা কোথায় যাব?’

ইউনিয়ন ব্যাংকের এক গ্রাহক জানান, মেয়াদ শেষ হলেও তিনি নিজের ডিপোজিটের টাকা তুলতে পারছেন না। এতে ঈদের সময় ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যায় পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিজের জমানো টাকা তুলতে না পারা–এটা আমাদের জন্য বড় শাস্তি।’

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, ব্যাংকের ভেতরে অনিয়ম ও যোগসাজশের মাধ্যমে ঋণের নামে অর্থ লুটপাট হয়েছে। তাদের দাবি, দায়ীদের সম্পদ বিক্রি করে হলেও আমানত ফেরত নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে আমানতকারীদের বিক্ষোভ চলাকালেই বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলন ডাকে। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিক বলেন, কোনো গ্রাহক অসুস্থ থাকলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে নিজ নিজ ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। এর বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। এ বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গ্রাহক সত্যিই অসুস্থ কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হবে। কেউ টাকা তুলতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, আমানতকারীদের টাকা ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে একটি নির্দিষ্ট স্কিম প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত পেতে আরও কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে শাহরিয়ার সিদ্দিক বলেন, স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীরা প্রথম দিন থেকেই ন্যূনতম দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন। পরবর্তী ধাপে প্রতি তিন মাস পরপর এক লাখ টাকা করে তোলা যাবে। এভাবে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ২১ মাসের মধ্যে পুরো অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, শুধু সাধারণ সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাব নয়, এফডিআর (মেয়াদি আমানত) ও ডিপিএসসহ বিভিন্ন ধরনের আমানতের ক্ষেত্রেও অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেসব এফডিআর বা ডিপিএস মেয়াদপূর্তির সময়ে পৌঁছাবে, সেগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে এক লাখ টাকা উত্তোলন করা যাবে। বাকি অর্থ নতুন করে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নবায়ন করা হবে। প্রতিবার নবায়নের সময় আমানতকারী তাদের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন, যদিও মূল অর্থ অপরিবর্তিত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, তিন মাস মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে তিনবার নবায়নের সুযোগ থাকবে। ছয় মাস মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে দুবার এবং এক বছর বা দুই বছর মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পুনঃনবায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।

এর আগে গত ৩০ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় শরিয়াহ্‌ বিশেষজ্ঞদের ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও শরিয়াহ্‌ বিশেষজ্ঞরা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারের অস্তিত্ব ও বাজারমূল্য স্বীকার করা এবং তাদের অসন্তোষ দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।