শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৩০ এএম, ২০২৬-০৪-০৫
জ্বালানিসংকটের বিরূপ প্রভাব পড়ছে জীবন-জীবিকায়। জ্বালানি তেলের মাধ্যমে যাদের জীবন-জীবিকা চলে, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। এ সংকটের কারণে তাদের আয়-রোজগারেও টান পড়েছে। কৃষিতে ফসলের সেচ, যানবাহন চলাচল, শিল্প-কারখানার উৎপাদন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে দেখা দিচ্ছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় সব ধরনের জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে কৃষিপণ্য অর্থাৎ শস্য উৎপাদনে সেচ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পেট্রল-অকটেন না পাওয়ায় পাঠাও-উবারের মতো রাইডশেয়ারিং সার্ভিস ব্যাহত হচ্ছে, যা তাদের প্রতিদিনের রোজগারে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ছোট-বড় কারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জেনারেটরের ডিজেল ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বাসাবাড়ি বা রেস্টুরেন্টসহ নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এলপিজি বা গ্যাসের সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে এলপিজি গ্যাসের দামও কোথাও কোথাও সংকটের সুযোগে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা। পাশাপাশি গতকাল রাজধানীর একাধিক সিএনজি স্টেশনে গ্যাস ছিল না বলেও জানা যায়।
রাজধানীর মেরুল বাড্ডার সবজি ব্যবসায়ী স্বপন দত্ত গতকাল বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাজারসহ সবখানে তার প্রভাব পড়েছে। শাকসবজির দামে আগুন লেগেছে। পটোল, ঢ্যাঁড়স, ঝিঙ্গা, বেগুনসহ সব সবজির পাইকারি দামই এখন ১০০ টাকার কাছাকাছি।
কারওয়ান বাজারের একাধিক আড়তদার বলেছেন, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তাই আড়তে আসা ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম চড়াচ্ছেন। এতে খুচরা ক্রেতারা বিপাকে পড়ছেন। তবে সার্বিকভাবে কেনাবেচাও কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেন জানান, সাড়ে ১২ কেজির এলপিজির সিলিন্ডার এখন স্থানীয় বাজারের দোকানে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহে এই সিলিন্ডার পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। যদিও সরকারি রেট বা নির্ধারিত মূল্য আরও কম। কিন্তু প্রায় বেশির ভাগ দোকানেই সরকারি রেটে সিলিন্ডার বিক্রি করা হয় না। এর মাঝে জ্বালানিসংকট বাড়তে থাকলে বাসাবাড়িতে রান্নাও বন্ধ হতে পারে।
রাজধানীসহ সারা দেশেই জ্বালানির বিরূপ প্রভাবে কমবেশি প্রায় একই রকম চিত্র বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্যুরোপ্রধান ও জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকে জানা গেছে প্রায় অভিন্ন তথ্য।
চট্টগ্রামে রাইডশেয়ারিং খাতে নেমে এসেছে অচলাবস্থা
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, জাহিদুল ইসলাম দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চট্টগ্রাম নগরীতে রাইডশেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালান। দীর্ঘ সময়ে পথ চলার মধ্যে কখনো এভাবে জ্বালানিসংকটে পড়তে হয়নি। কখনো দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়নি। এবারই চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হলো তাকে। আলাপকালে গতকাল তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘অনেকেই প্রয়োজন ছাড়াই বাইকের ট্যাংকি ভর্তি করে রাখছেন তেল। তাদের কারণে যাদের প্রয়োজন তারা তেল পাচ্ছেন না।’
শুধু জাহিদুল ইসলাম নন, তার মতো চট্টগ্রামের হাজারও বাইক রাইডারের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে জ্বালানিসংকট। দেশজুড়ে চলমান জ্বালানিসংকটের কারণে রাইডশেয়ারিং খাতে নেমে এসেছে অচলাবস্থা। বিশেষ করে মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইডশেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হাজারও চালকের চোখে অন্ধকার। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা শুধু জ্বালানি সংগ্রহের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে চালকদের। এতে করে কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে এবং যাত্রীসেবা দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।
চালকরা জানিয়েছেন, আগে যেখানে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করে ভালো আয় করা যেত, এখন সেখানে অর্ধেক সময়ই চলে যাচ্ছে জ্বালানি সংগ্রহে। তারা বলছেন, তেলের জন্য ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে ব্যাপক। ফলে আয় করবেন কখন, সেটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বেকারত্ব বাড়ার কারণে রাইডশেয়ারিংয়ের চালকদের সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের মতে, জ্বালানিসংকট দীর্ঘায়িত হলে এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
রংপুরে ডিজেলসংকটে বোরো উৎপাদন হুমকির মুখে
জ্বালানি তেলের সংকটে রংপুর অঞ্চলে ব্যাহত হচ্ছে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম। ফলে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকদের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষিব্যবস্থায়।
কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো ডিজেল না পাওয়া, সীমিত সরবরাহ এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদে অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তবে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনে মনোযোগী হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন কৃষকরা।
মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৩০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক একর জমিতে মাটির ধরন অনুযায়ী বোরো চাষে ১৫ থেকে ২০ বার সেচ দিতে হয়। এতে প্রয়োজন হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই ডিজেলসংকটের কারণে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
গত শুক্রবার রংপুর-পার্বতীপুর সড়কে খালেক তেল পাম্পে কথা হয় নওশাদ আলীর সঙ্গে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘দুইটা-তিনটা তেলের পাম্প ঘুরলাম শেষে ৩ নম্বর তেল পাম্প এসে দুই লিটার ডিজেল পাইলাম। ২০০ টাকার ডিজেল নিতে আমার যাতায়াত খরচ ১২০ টাকা। এই তেলে ৪ ঘণ্টাও মেশিন চলবে না। এবার যে ধানের কী হবে, তা আল্লাহ ভালো জানেন।’
গত শুক্রবার রংপুর-পার্বতীপুরের সাতটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, এর মধ্যে চারটি পাম্পই বন্ধ। কোনো লোকজন নেই। তেল নিতে এসে লোকজন ফিরে গেছেন।
খালেক পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক জানান, যারা ডিজেলের জন্য আসছেন তাদের দুই থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। তেল থাকলে যেকোনো সময়ে এসে নিতে পারবে।
রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা পাম্প থেকে ঠিকমতো ডিজেল পাচ্ছি না। প্রতি মেশিনে দুই লিটারের বেশি দিচ্ছে না। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা হলেও তা সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা পরিবহন খরচ লাগছে। এতে আমাদের লাভ তো দূরের কথা, খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে যাবে।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলে ডিজেলসংকটে কিছুটা সমস্যা হলেও গুরুতর সমস্যা আমাদের চোখে পড়েনি। প্রকৃতি আমাদের কিছুটা ভালো অবস্থায় রেখেছে।’
চুয়াডাঙ্গায় ‘ফুয়েল কার্ড’ থাকার পরও চরম ভোগান্তি
তেলসংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন চুয়াডাঙ্গার মানুষরা। বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে তেল নিতে গিয়ে না পেয়ে প্রচণ্ড ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। প্রবাল কুমার দাস নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামীকাল আমার বাড়ি থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অফিসে যেতে হবে, অথচ শুক্র ও শনি এই দুই দিন ঘুরেও আমি তেল পেলাম না।’
আবির হোসেন নামের এক এনজিও কর্মী বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ৬০ কিলোমিটার ঘুরে ঘুরে আমাকে টাকা কালেকশন করে বেড়াতে হয়। ফুয়েল কার্ড নিয়েও তেল না পাওয়ায় আমি দুই দিন কাজ করতে পারিনি। আজকে ৭ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পেলাম না। এই ফুয়েল কার্ডের মূল্য কোথায়?’
প্রায় অভিন্ন দুরবস্থা ও সংকটের অভিযোগ করেন প্রাণীর জরুরি ওষুধ নিয়ে কাজ করা মেহেদী হাসান নামে এক বিক্রয় প্রতিনিধি।
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বি এম তারিক উজ জামান বলেন, গতকাল কার্ড ছাড়া তেল দেওয়ায় কয়েকটি পাম্পে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রশাসন কাউকে কোনো ছাড় দেবে না।
গোপালগঞ্জে জ্বালানি তেলের সংকটে সেচ বন্ধের শঙ্কা
গোপালগঞ্জে তীব্র জ্বালানিসংকটে কৃষি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে না পেরে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করেও মিলছে না প্রয়োজনীয় তেল। এতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এবং বাজারে কঠোর নজরদারি না বাড়ালে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে সচেতন মহল।
জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নেই। ফলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। কৃষি কার্ড দেখিয়েও প্রয়োজনমতো তেল মিলছে না। এ ছাড়া বর্তমানে বোরো মৌসুম চলছে। এই সময়ে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। কৃষকরা বলছেন, সেচ না দিতে পারলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এরই মধ্যে অনেক জমিতে ধানগাছে শিষ এসেছে। কিন্তু পানি না পেলে এসব শিষ থেকে আসা ধান চিটা হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে এরই মধ্যে অনেক জমি পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, যা পুরো মৌসুমে কৃষিকাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক শারফুল শরীফ বলেন, ‘প্রতিদিন আমার কমপক্ষে পাঁচ লিটার তেল দরকার। পাঁচ দিন আগে মাত্র এক লিটার তেল পেয়েছিলাম। এতে তিন-চার দিন জমিতে সেচ দিতে পারিনি। আজ আবার ভোরে পাম্পে এসেছি। ৩ ঘণ্টা পার হলেও তেল পাইনি। যদি এভাবে চলতে থাকে, আমার জমির সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে সারা বছর পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে?’
অন্য কৃষক শুহিন মোল্যা বলেন, ‘তেলের অভাবে কয়েক দিন ধরে জমিতে পানি দিতে পারছি না। মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে। গাছ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দ্রুত তেলের ব্যবস্থা না হলে বড় ক্ষতির মুখে পড়ব। কৃষি কার্ড দিয়েও তেল পাচ্ছি না।’
কুড়িগ্রামে ডিজেলসংকটে বিপাকে জেলেরা
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে জ্বালানি তেলের সংকট চরমে পৌঁছেছে। দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকার চলাচল কমে গেছে। অনেক জায়গায় নৌকা বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন চিলমারী উপজেলার জেলেরা। ডিজেলের অভাবে নৌকা চালাতে না পারায় তারা নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। এতে তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।
এমন অবস্থায় গত মঙ্গলবার দুপুরে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তারা দীর্ঘ সময় সেখানে বিক্ষোভ করেন। পরে ইউএনও তাদের সঠিক দামে তেল দেওয়ার আশ্বাস দেন। এরপর জেলেরা সেখান থেকে চলে যান। তবে তারা অভিযোগ করেন, ডিলারদের কাছে তেল থাকলেও তারা দিচ্ছেন না। বেশি টাকা দিলেই তেল মিলছে। প্রশাসন এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
বেলাল হোসেন নামে এক জেলে বলেন, ‘তেল না থাকায় কয়েক দিন ধরে নদীতে যেতে পারছি না। মাছ ধরতে না পারায় আয় নেই। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মো. আশরাফ নামে আরেক জেলে বলেন, ‘আমাদের তেমন টাকা জমানো থাকে না। যেটুকু জমানো ছিল তাও শেষ। এখন ধারদেনা করে তেল কিনতে হচ্ছে। তবু তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার নিয়ে চিন্তায় আছি।’
নাগেশ্বরীর আয়নালের ঘাটের ইজারাদার আবু সিদ্দিক বলেন, ‘কয়েক দিন আগে কয়েকটি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে কিছু তেল নিয়েছি। এখন তাও শেষ হয়ে গেছে। এতে নৌকা চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান তেলের সংকটের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার কাছে সব তথ্য আছে। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিজেলসংকটে বিপাকে আনোয়ারা উপকূলের ১৫ হাজার জেলে
প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলে ডিজেলসংকট কাটেনি। জ্বালানি তেল না পাওয়ায় মাছ ধরা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে উপজেলার অন্তত ১৫ হাজার মৎস্যজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
স্থানীয় খোলা বাজারগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে না তেল। ফলে উপকূলের শত শত ট্রলার ঘাটে অলস পড়ে আছে।
রায়পুরের জেলে আব্দুল মোনাফ বলেন, ‘আমাদের বাজারে চার থেকে পাঁচ লিটার তেল পাওয়া যাচ্ছে। এই তেল দিয়ে কতক্ষণ চলবে। আমরা এক মাস ধরে ট্রলার তীরে বেঁধে রেখেছি। তেলের সংকটের কারণে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে আমাদের পথে বসতে হবে।’
পূর্বগহিরা ধলঘাট এলাকার মৎস্যজীবী আবদুল আজিজ বলেন, ‘তেল না থাকায় আমাদের দুটি ট্রলার এক মাস ধরে সাগরে যেতে পারেনি। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।’
আরেক জেলে সাইফুল ইসলাম জানান, মাছ শিকারই তাদের একমাত্র জীবিকা। দীর্ঘদিন সাগরে যেতে না পারায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
গহিরা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান জানান, জ্বালানিসংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় পুরো মৎস্য খাত স্থবির হয়ে পড়েছে।
কলাপাড়া উপকূলে ২০ হাজার জেলে পরিবারে হাহাকার
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা বন্দরসহ মৎস্যবন্দর মহীপুর, আলীপুর ও কুয়াকাটার জেলেরা জ্বালানি তেলের (ডিজেল) ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। সমুদ্রের গভীর-অগভীর এলাকায় শতকরা ৯০ ভাগ জেলে মাছ শিকার করতে পারছেন না। ফলে এসব জেলে পরিবারে চরম দুরবস্থা নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন গভীর সমুদ্রগামী জেলেরা। কারণ এসব জেলেদের একেক ট্রিপে ৬০০ থেকে ৭০০ থেকে প্রায় এক হাজার লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। জ্বালানি তেলের সংকটে বর্তমানে গভীর সমুদ্রগামী প্রায় ২৫০ ট্রলার মহীপুর-আলীপুর মৎস্য বন্দরসংলগ্ন খাপাড়াভাঙ্গা নদীতে নোঙর করে আছে। অনেক ট্রলারমালিক জেলেদের বরফ, বাজার সওদা, খাবারসামগ্রী কিনে দিলেও সাত-আট দিনেও জ্বালানিসংকটে সাগরে যেতে পারছেন না। উল্টো ঘাটে বসে বসে সব রসদ শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ জেলে, বোটমালিকদের একই দশা। কবে নাগাদ তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাবেন, তাও কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি।
মহীপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা জানান, এখানে দৈনিক ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এর এক-দশমাংশ সরবরাহ নেই। ফলে জেলে পেশায় ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি জেলেদের সাগরে যাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ২৭ হাজার লিটার জ্বালানি তেল (ডিজেল) সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সূত্র খবরের কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত