রেলওয়ের ওয়াশিং প্ল্যান্টে ‘ভ্যারিয়েশন কেলেঙ্কারি’

দুর্নীতিবাজকে আড়াল করার চেষ্টা!

Passenger Voice    |    ১০:৫১ এএম, ২০২৬-০৪-০৫


দুর্নীতিবাজকে আড়াল করার চেষ্টা!

এক বছর ধরে অনিয়মের তদন্ত হয়েছে। তদন্তে দুর্নীতি শনাক্ত হয়েছে। তবু দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের শাস্তির সুপারিশ না করে ভিন্ন পথে সময়ক্ষেপণ করছে তদন্ত কমিটি। এ ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ রেলওয়েতে। অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অটোমেটিক ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত একাধিক অসংগতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে দীর্ঘ এক বছর তদন্ত শেষে দায় নির্ধারণ না করে উল্টো রেলওয়ের কাছেই ব্যাখ্যা চাওয়ায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ২৪ মার্চ ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রায় এক বছর পর চলতি বছরের ১৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দিয়ে রেলওয়ের কাছে অনুমেয় কিছু প্রশ্নের ব্যাখ্যা চেয়েছে তদন্ত কমিটি। আর এতেই রেলওয়েতে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।

রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এতে প্রকৃত অপরাধীকে সময়ের মারপ্যাঁচে ব্যাখ্যা চেয়ে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট মতামত চাইলেও ব্যাখ্যা দাবি করে প্রকৃত দুর্নীতিবাজকে কমিটি আড়াল করতে চাইছে। ফলে সরকারি টাকার অপচয় বা লুট বন্ধ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা ভবিষ্যতে দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে উৎসাহিত করবে, এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ক্ষেপণের লক্ষ্যে প্রকৃত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে ব্যাখ্যা চাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই অভিযোগের বিপরীতে রেলসচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, প্রকৃত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে খুঁজে বের করতেই ব্যাখ্যা চেয়েছে তদন্ত কমিটি।

রেল কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক জিয়াউল হককে একাধিকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ না করায় তার মতামত পাওয়া যায়নি।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন ধোয়ার জন্য ঢাকা ও রাজশাহীতে দুটি ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হককে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুতর গরমিল উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রেনের বাইরের অংশের পাশাপাশি ভেতরের যন্ত্রাংশ পরিষ্কারের পরিকল্পনা থাকলেও এ-সংক্রান্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ নকশা বা লে-আউট সংগ্রহ করা হয়নি। ফলে প্রকল্পের নকশাতেই বড় ধরনের ত্রুটি ছিল।

ক্রয়-প্রক্রিয়ায়ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের ভ্যারিয়েশন বা ব্যয়ের পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রকৃত হার ছিল ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। কিন্তু তা কমিয়ে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ দেখানো হয়, যাতে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে নিষ্পত্তি করা যায়। বিদ্যমান ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী, ভ্যারিয়েশন ১৫ শতাংশের বেশি হলে তাতে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

এ ছাড়া ডলার বিনিময় হার নির্ধারণেও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের প্রস্তাবে প্রতি ডলারের মূল্য ৭৯ টাকা ৬৫ পয়সা ধরা হলেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৮৪ টাকা ৮৯ পয়সা হারে। কেন বেশি দামে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নকশা পরিবর্তন, দর-কষাকষি-প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব বণ্টনে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি প্রকল্প পরিচালক এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভ্যারিয়েশনের নামে অর্থ লোপাটের বিষয়ে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মূল চুক্তিপত্রে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ ছিল না। চুক্তির বিশেষ শর্ত ও সাধারণ শর্ত–উভয় অংশেই এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। দরপত্র দলিলেও মূল্য স্থির থাকার কথা বলা হয়। কিন্তু এসব শর্ত উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ২২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি দেখিয়ে বিল অব কোয়ান্টিটি দাখিল করা হয়।

প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদ তার নোটে উল্লেখ করেছিলেন, এই ভ্যারিয়েশন গ্রহণযোগ্য নয় এবং এতে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় ভ্যারিয়েশনের নামে অতিরিক্ত প্রায় ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এতে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। ঢাকা ও রাজশাহীতে দুটি ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী সংসদীয় কমিটির সভাপতির ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, প্রকল্প চালুর পর ওয়াশিং প্ল্যান্টে বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দিলেও তা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি রেলওয়ে। ফলে কোটি টাকার এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তদন্তে এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর রেলপথ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। সেখানে দ্রুত জবাব দিতে বলা হয়েছে এবং সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে তদন্ত শেষে সরাসরি ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্ত কমিটির ব্যাখ্যা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, তদন্ত কমিটির আরও কম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল বলে মনে করি। কাউকে আড়াল করার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারব না। কারণ তদন্তাধীন বিষয়ে কোনো এক দিকে ইনডিকেট করা সম্ভবত ঠিক হবে না। তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা চিহ্নিত করা হয়নি বা কেমন দুর্নীতি হয়েছে, তা স্পষ্ট না করে ব্যাখ্যা চেয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে আফজাল হোসেন বলেন, তদন্ত শুরুর প্রথম ধাপেই এটা চাইতে পারত কমিটি। তবে মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং তদন্ত-প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’ সূত্র খবরের কাগজ