জ্বালানি তেল যেন সোনার হরিণ

Passenger Voice    |    ১০:৪৭ এএম, ২০২৬-০৪-০৪


জ্বালানি তেল যেন সোনার হরিণ

পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার চিত্র এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়া এবং সরবরাহ সংকট–এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে।

রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি গতকাল দিনভরই ছিল। চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়েই খাবার খেয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা যায়, যারা বেলা্ ১১টার দিকে তেল পাচ্ছেন, তারা আগের দিন অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১১টা বা ১২টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্থাৎ প্রায় ১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে তেল নেওয়ার সুযোগ।

আসাদগেট এলাকায় সোনার বাংলা সার্ভিস সেন্টারে লাইনের দৈর্ঘ্য ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়কজুড়ে। এর ঠিক অপর পাশে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন আসাদগেট থেকে শুরু হয়ে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত পৌঁছে। একই চিত্র দেখা গেছে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে। সেখানে বাইক ও প্রাইভেট কারের লাইন চলে যায় মহাখালী রেললাইন পর্যন্ত। দীর্ঘ লাইন ছিল সিটি ফিলিং স্টেশনেও। সেখানে গাড়ির লাইন গিয়ে ঠেকে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড পর্যন্ত। স্টেশনগুলোর কোথাও কোথাও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পাম্প কর্তৃপক্ষ ফিতা ও দড়ি ব্যবহার করে আলাদা লাইন তৈরি করে।

গতকাল সকাল থেকে প্রচণ্ড রোদে ক্লান্ত হয়ে অনেক চালককে রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় বসে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তাদের কারও গাড়িতে তেল প্রায় শেষ, অল্প কয়েক কিলোমিটার চলার মতো অবস্থায় ছিল। বাধ্য হয়ে তাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাদের।

গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক চালক আবার পালাক্রমে লাইনে অবস্থান করেছেন। বন্ধু বা পরিবারের সদস্যরা একে অপরের গাড়ি ধরে রেখে দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। তাদের ভাষায়, ‘তেল এখন সোনার হরিণ।’

তেলসংকটে রাইডশেয়ারিং চালকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। ঈদের পর ঢাকায় ফেরা যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও তেল সংগ্রহ করতেই তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। রাইডশেয়ারিং চালক ইমরান হোসেন বলেন, ‘সারা দিন রাস্তায় থাকার কথা, যাত্রী তুলব কিন্তু তেল নিতেই ৮-১০ ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। আয় বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়।’

আরেক মোটরসাইকেলচালক সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পাঁচ লিটার তেল চাইলে দেয় দুই বা তিন লিটার। তাও আবার এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এটা কেমন ব্যবস্থা?’

তালুকদার ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক আজাদ মিয়া নিজের গাড়ি ঠেলছিলেন। তার গাড়িতে একটুও তেল নেই। লালমাটিয়া থেকে ঠেলে ঠেলে স্টেশন পর্যন্ত এনেছেন। এখন দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে আজাদ বলেন, ‘গাড়িতে তেল শেষ হয়ে গেছে, ঠেলে পাম্পে নিয়ে এসেছি। এখন যদি তেল না পাই, তাহলে পুরো দিনটাই নষ্ট।’

আরেক ভুক্তভোগী মাহবুব আলম বলেন, ‘সচিবালয়ের গাড়িগুলোকে যদি এভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হতো, তাহলে তারা আমাদের কষ্ট বুঝত। আমরা সাধারণ মানুষ হয়ে যেন শাস্তি পাচ্ছি!’

সপ্তাহে বন্ধের দিনেও এমন লম্বা লাইনের কারণ কী? স্টেশনগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেকেই সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্রবার তেল নিচ্ছেন, যাতে রবি বা সোমবার গাড়ি চালাতে সমস্যা না হয়। অর্থাৎ আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বন্ধের দিনেই তেল মজুত করছেন প্রাইভেট কারচালকরা।

গ্রাহকদের অভিযোগ, কিছু পাম্পে ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত সুবিধা নিতে টিপস নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেছেন তারা। তবে পাম্পকর্মীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, হঠাৎ করে তেলের চাহিদা ৮ থেকে ১০ গুণ বেড়ে গেছে, অথচ পাম্পে কর্মীসংখ্যা সে তুলনায় অনেক কম। আগে যেখানে ১০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল নেওয়া হতো, এখন অনেকেই ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার তেল নিচ্ছেন, ফলে চাপ বেড়েছে বহু গুণ।

যদিও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনেক পাম্পেই অকটেন ও ডিজেলের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। 

এদিকে গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দ করা জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। এই তালিকা থেকে বাদ যাবেন না প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। এ ছাড়া সরকারি কার্যালয়ে সব ধরনের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবাসিক ভবনে শোভাবর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ ও অনাবাসিক ভবনে শোভাবর্ধন ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে।